রোমান সাম্রাজ্যে আমরা

হান এয়ারপোর্ট, জার্মানি

– তোমার ব্যাগের কসমেটিকস সব বের করো, অফিসার বললো।

হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করেছি। লাইনে দাঁড়িয়েছি, সামনের প্রায় সবাই খানিকটা বিব্রত, কেউ ক্ষুব্ধও! হচ্ছেটা কী? এদিকে আমাদের বাদর স্বভাববিশিষ্ট পুত্রও লম্ফঝম্ফ দিচ্ছে। উনি আবার  বেশিক্ষণ এক জায়গাতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। আমার সামনে ছেলের বাবা, অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ঝাড়ি দিলো! অামি বরাবরই সব কিছুতেই স্লো। তো তার রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে আরও খানিকটা ভ্যাবাচাকাই খেয়ে গেলাম। ভাবলাম নিশ্চয়ই আমার দোষ। কিন্তু কী দোষ তখনও বুঝে উঠিনি। যথারীতি সাদামুখো মহিলার কথা শুনে বের করলাম … লোশন, সান ক্রিম, শ্যাম্পু, শাওয়ার জেল।

– যাও, এইরকম একটা ব্যাগ এনে এগুলা ভরো, অফিসার অাবারও বললো।

এরই ভেতর পুত্র অপরপাশে চলে গিয়েছে! আমি একবার ছেলে একবার বর – এইরকম ঝামেলার পরিস্থিতিতে আরেকবার ভস্ম হলাম, চলে এলাম ছেলেকে সামাল দেবার জন্য। এদিকে ব্যাগে ছেলের পানির বোতলও তারা বের করে রেখে দিয়েছে। কিন্তু ছেলে নাকি পানি খাবে, আবার চিপসও খাবে। অফিসাররা সবাই যারপরনাই আনন্দিত। কেন? কারণ তারা আসলে সবার জিনিস ধরছে আর ফেলে দিচ্ছে। জনগণের জিনিস ফেলার মজাই আলাদা।

অামাদের তিন সদস্যবিশিষ্ট টিমের ক্যাপ্টেন, ছেলের বাবা ডাবল রক্তচক্ষু নিয়ে আমাদের ব্যাগসমেত এলেন। এবং যথারীতি আমার দিকে তাকালেন, কেউই দেখতে পেলো না, কিন্তু আমি ভস্ম হয়ে গেলাম, আমার ছাই মেঝেতে পড়লো। টিমের ক্যাপ্টেনকে শুধু পেস্ট আর ব্রাশ ধরিয়ে দিয়েছে। যাক, তারা যে অন্তত দাঁতের যত্নে সচেতন এটা ভেবে শান্তনা পেলাম। এর আগে সবসময় মেইন লাগেজে থাকতো, এইবার হ্যান্ড ব্যাগে নিয়েই ধরা খেলাম। তো দোষ কার? যে ব্যাগ গুছিয়েছে, অবশ্যই তার! আমার আর কি!

রোমা, ইতালি 

প্রায় রাত ৮টার দিকে প্লেন ল্যান্ড করলো সাত পাহাড়ের শহর ইতালিতে। এয়ারপোর্টে নেমে প্রথমেই বাসের টিকেটের খোঁজ নিলাম। ক্যাপ্টেন দু’জনের জন্য টিকেট কেটে ফেললো। পুত্রের ফ্রি। বাসেে উঠতে যাবো এমন সময় এক বুড়া আমাদেরকে খুব হাত নেড়ে কিছু বললো।

– ড্রাইভার বলছে, …..

ক্যাপ্টেন বললো, ইংরেজি তে বলো, তোমার ভাষা বুঝতে পারছি না!

– ড্রাইভার বললো, …

ক্যাপ্টেন বললো, সরি, তুমি ইংরেজি জানো?

– ড্রাইভার বললো, …

ক্যাপ্টেন এইবার মেজাজ খারাপ করে তাকিয়ে থাকলো।

ড্রাইভার বললো, নো ফুড।

মনে মনে ভাবলাম, ব্যাটা বদ, ভাষাবিদ আসছে, ইংরেজি জানিস যখন একগাদা ভাষা বললি কেন? আমাদের হাতে কোন খাবার অাছে?

ঐ ব্যাটাকে নিচে রেখে বাসের দোতলাতে উঠে বসলাম। বাস ছেড়ে দেয়ার কিছুক্ষণের মাঝেই পুত্র অনেক কষ্ট করেও তার চোখ খোলা রাখতে পারলো না; অবশেষে টিম ক্যাপ্টেনের কোলে ঘুম! বাস থামলো টার্মিনালের কাছে গিয়ে। হোটেল অনলাইনেই বুকিং করা ছিল। হোটেল আন্দ্রিওতি, তিন তারার হোটেল। টার্মিনালের কাছেই। টার্মিনালে বাস আর ট্রেন দু’টোরই মেইন স্টেশন। আশেপাশে প্রচুর খাবার দোকান। গুগল ম্যাপ আমাদের হোটেলের পথ চিনিয়ে নিয়ে গেল। পুত্রকে এবার আমার কোলে নিয়ে হাঁটার পালা। সে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে ততক্ষণে, কিন্তু কোল থেকে নামছে না। গলা ধরে ঝুলে অাছে, সে বাইরে বের হলে বান্দর স্বভাববিশিষ্ট হয়ে যায়, বাবা-মায়ের গলা ধরে ঝুলে পড়ে! বলে রাখা ভাল, স্থির হয়ে বসে থাকা তার স্বভাব বিরুদ্ধ।

অবশেষে হোটেলে চেক ইন করলাম তখন রাত ৯ টা। ডিনার করতে বাইরে যেতে ইচ্ছা করছে না, অগত্যা টিম ক্যাপ্টেন ভরসা। তিনি এক অসাধারণ স্ট্যামিনায় ভরপুর ক্যাপ্টেন, টিমের সামান্য কষ্টেও তার প্রাণ কাঁদে, তাই নিজের ক্লান্তি ভুলে খাবারের সন্ধানে গেল!

বাংলাদেশি অভিবাসী, রোমা

বাসের টাইমটেবল দেখে আমরা বেরিয়ে পরলাম কলোসিয়ামের উদ্দেশ্যে। টার্মিনাল পর্যন্ত হেঁটে যাবো, ফুটপাতে বেশ কিছু সুভিন্যরের দোকান সারি সারি। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পুত্র তার স্বভাব অনুযায়ী দৌঁড়ে গিয়ে ঢুকলো; দেখি দোকানের মালিক বাংলাদেশি। আমরা ভাবলাম, দেশি বলে কথা, কিছু কিনি। ক্যাপ কিনলাম, আর পুত্র ছোট্ট একটা গাড়ি ফ্রিতে পেলো, দোকানদার কিছুতেই দাম নেবে না আমাদের থেকে। আমাদের ছেলেকে দেখে তার দেশে থাকা ছোট্ট ছেলের কথা মনে পড়ে গিয়েছে বলে মন খারাপ করলো আমাদের কাছে।

এতদিন শুধু পত্রিকাতে পড়েছি, পুরো ইতালি ভ্রমণে অভিজ্ঞতা হলো যে, পুরো ইতালি বিশেষ করে রোম শহর পুরোটাই বাংলাদেশি প্রবাসী দিয়ে ভর্তি। এখানে কেউ বৈধভাবে আছে, কেউবা অবৈধভাবে। বেশিরভাগই সাগর পাড়ি দিয়ে অাসা অবৈধ অভিবাসী হওয়ায় দেশেও যেতে পারে না ইচ্ছা করলেই। অনেক কষ্টে দিন পার করে। উপার্জন করে দেশে পাঠায় নিজেদের সংসারে। কত অল্প বয়সী ছেলেরাও কত ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে কত জায়গা দিয়ে ঘুরে অবশেষে এখানে পৌঁছেছে একটু ভালভাবে থাকার আশায়; কিন্তু পারছে কি? বেশিরভাগই টুরিস্ট এরিয়াতে কিছু না কিছু বিক্রি করছে। এক কথায় যেন ছোটখাট বাংলাদেশ! যারাই বুঝতে পেরেছে যে আমরা বাংলাদেশি তারাই কিছু না কিছু অামাদের পুত্রকে দিয়েছে এবং বলাই বাহুল্য দাম ছাড়াই। অন্যরকম এক ভালবাসা, অামরা অপরিচিত, কিন্তু যেন সবাই সবার অনেক পরিচিত, সবাই বাংলাদেশি!

কলোসিয়াম, রোমা

21740356_10159614253250122_6616184699377211318_nবিশাল লাইন কলোসিয়ামের গেইটে। অামাদের ক্যাপ্টেন জ্ঞানী হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকালো। বললো, দেখছো, অামি অনলাইনে আগে থেকে টিকেট না কেটে রাখলে তো এই রৌদ্র আর গরমের ভেতর দাঁড়ায় থাকতে হইতো। অামার একটু জ্ঞানী হাসি দিতে ইচ্ছা করলো, কার দিকে তাকায় দিবো? পেয়ে গেলাম, যখন অামরা টিকেট হাতে ঢুকে যাচ্ছি, তখন যারা দাঁড়িয়ে অাছে লাইনে, তাদের দিকে তাকায় একটুখানি জ্ঞানী হাসি দিলাম। ঢুকলাম কলোসিয়ামের ভেতরে। আশেপাশের সবার চেহারা দেখে মনে হলো, এমন সৌন্দর্য্য এরা অাগে কোনদিন দেখে নাই, তাই সবার চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে!

টিম ক্যাপ্টেন হতাশ চোখে তাকিয়ে থেকে পুত্রকে বললো, এই ভাঙ্গা জিনিস দেখার জন্য তোমার মা কতদিন থেকে উতলা! তারপর অামার দিকে তাকিয়ে বললো, যাও মনে মনে ভাবো কত বছর আগে এখানে কিভাবে কী হতো, অার তাকায় তাকায় দেখো! বেচারা! তার ইচ্ছা ছিল, বার্সেলোনার মাঠে গিয়ে খেলা দেখবে, এটা মনে হলেই তিনি আনন্দে আটখানা হয়ে যান, তার তো এই ভাঙ্গা জিনিস দেখে হতাশই লাগার কথা!

 

এখানেই মজা, যার কল্পনা শক্তি যত ভালো, তার তত ভালো লাগবে এই স্থাপত্যটিকে। এই ভাঙ্গাচোরার মাঝে প্রায় ২৫০০ বছরের কত অজানা গল্প লুকিয়ে আছে! সেই কত হাজার বছর আগে ছাদ ছাড়া এই মঞ্চটি তৈরী করা হয়েছিল প্রায় ৫০,০০০ মানুষের বসার উপযোগী করে! রোমের ইতিহাসের উত্থান ও শৌর্যের সময়ের তৈরি বিশাল এই এম্ফিথিয়েটার পৃথিবীর এক আশ্চর্য ঐতিহাসিক স্থাপত্য। তাকালাম সামনের দিকে অার মনে পড়ে গেলো অস্কার জেতা ছবি গ্ল্যাডিয়েটরের কথা!  এই স্থাপত্য বহন করছে মানুষের প্রতি নির্মমতার গল্প, এর দেওয়ালের প্রতিটি পাথরে যেন গ্ল্যাডিয়েটরদের বীরত্ব, রক্ত, ঘামের গন্ধ গাঁথা!

21740939_10159614286995122_5808971120427519441_o৭০-৭২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে, ফ্লেবিয়ন সাম্রাজ্যের শাসক ভেসপাসিয়ানের রাজত্বকালে এর নির্মাণ শুরু হয়েছিল। দশ বছর ধরে  প্রায় ৬০,০০০ ইহুদি দাসকে কাজে লাগিয়ে ৮০ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণ কাজ শেষ করেন তাঁর পুত্র টাইটাস। তিনি এটিকে ’ফ্লেবিয়ন এ্যাম্পিথিয়েটর’ নাম দিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন এবং ১০০ দিনব্যাপী এক উৎসবের আয়োজন করেন যেখানে গ্লাডিয়েটরসদের মধ্যে মল্লযুদ্ধ ও বিভিন্ন ধরনের পশুর লড়াইয়ের আয়োজন হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী চারশ বছর ধরে এটি হয়ে ওঠে রোমানদের ‘বিকৃত মনোরঞ্জনে’র একটি রক্তাক্ত লড়াইয়ের মঞ্চ। শতশত বছর ধরে এই লড়াইয়ে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ ও প্রাণী মারা গিয়েছে বলে অনুমান করা হয়। নিচের ভাঙ্গা পিলারগুলোর দিকে তাকালে যেন এক অজানা আতঙ্ক জেগে ওঠে। মনে হয় যেন দেখতে পাই সেই যুদ্ধবন্দীদের, যারা নিচের কারাগারে বন্দী থাকতো অার ডাক পরলেই মৃত্যুযুদ্ধে সামিল হতো। গ্লাডিওররা ছিল সেই সময়কালীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আর সব সমাজেই তো প্রান্তিকদের শোষণ করা, তাদের নিয়ে খেলা শোষকদের জন্য, ক্ষমতাশালীদের জন্য জায়েজ, নয় কি?

রেস্তোরা, রোমা

এক রেস্তোরাতে গেলাম। পুত্রকে নিয়ে কোথাও বসে খাওয়ার সুযোগ নেই। আগেই বলেছি, সে স্থির হয়ে বসার মানুষ নয়। আর যেখানে সে যাবে সেই জায়গাটা তার পছন্দ না হলে তো খবরই আছে আমাদের। তো সাহস করে গেলাম খেতে। পুত্র নানান ক্যারিকাচার করছে, অামরা বিব্রত এবং অন্যরা অত্যন্ত আহলাদিত! সবার খাবার সাথে বিনোদন ফ্রি! দু’জন খাবার শেষ করে চলে যাওয়ার সময় পুত্রকে বললো, চল অামার সাথে! পুত্র কিছুক্ষণ তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো। তারপর তাদের সাথে রওনা দিলো। রেস্তোরার সবাই আনন্দধ্বনির মতো শব্দ করলো। এখন তো ছেলে আর আমার কাছে আসে না তো আসেই না! এ কি যে বিপদ!

আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করলো রেস্তোরার একজন ওয়েটার। পুত্রকে চট করে কোলে তুলে নিয়ে রেস্তোরার দরজাতে দাঁড়িয়ে বলতে থাকলো, হান্ড্রেড ইউরো, হান্ড্রেড ইউরো..! বাইরে রাস্তায় গমগম করছে টুরিস্টরা। তাদের মধ্যেও অানন্দধ্বনি শোনা গেল। রেস্তোরার ভেতরের সবার মাঝেও শোনা গেল! আমার পুত্রের চঞ্চলতায় কেউ বিরক্ত হলো না, এমনকি এত ব্যস্ত ওয়েটাররাও। এমন ব্যস্ততার মাঝেও তারাই বলতে গেলে পুত্রকে সামলিয়েছে এবং আমাদেরকে অনেক স্বস্তি দিয়েছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: