ভালবাসায় বসত: জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস

আজ কুয়াশাঢাকা ভোরবেলাতেই ঘুম ভেঙ্গেছে। জানালা দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে হঠাৎ একটা শীত শীত গন্ধ পেলাম যেন !! সেই ক্যাম্পাসে যখন শীত আসি আসি করতো, তখন আমি কেমন যেন একটা গন্ধ পেতাম, কেমন যেন একটা আমেজ, জানি না অন্যরাও পেতো কিনা; সেই রকম। প্রচন্ড নষ্টালজিক হলাম! আহ্….. আমার শৈশব, কৈশর….. সব যেন মিশে এক হয়ে আছে এই ক্যাম্পাসে।
মনে আছে অাম্মু ভোর বেলায় ঘুম থেকে টেনে তুলে হারমোনিয়ামের সামনে নিয়ে বসাতো রেওয়াজ করার জন্য…. রাগ আশাবরী!! সম্মহোণ করা তার সুর; কিন্তু শীতের সকালে লেপের নিচের ওমের অারাম ছাড়া আর কিছু্ই যেন মূর্চ্ছনাতে সেই সময় আচ্ছন্ন করতেই পারতো না আমাকে!! উঠতেই চাইতাম না। অাম্মুরও ছাড়াছাড়ি নেই, লেপের মধ্যেই ঢুকিয়ে দিতো হারমোনিয়াম; তাও রেওয়াজ করতেই হবে!! অাস্তে আস্তে করে যতই সুরের ভেতরে ঢুকতাম, ঘুম ভাঙ্গতে থাকতো!! আম্মু আমাকে খেলতে বাইরে যেতে দিতো না তেমন। বিশাল বাউন্ডারীর ভেতরেই সব ব্যবস্থা, সব আছে; শুধু আমার বয়সী কেউ নেই। আম্মু ভয় পেতো, কারণ আমি যতবারই বের হয়েছি কোন না কোন অঘটন ঠিকই ঘটিয়েছি।তাঁর সবেধন নীলমনি একটিই ছানা, তাই রিস্ক নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না!! স্কুল তখন ছুটি হতো ১২:৩০ টায়। দুপুরে মা-মেয়ে ভাত খেয়ে গরম লেপের নিচে একটা বিস্কিটের বিশাল বাক্স নিয়ে শুতাম। কত কথা আমাদের। একসময় আবার বিকালের গলা সাধার পালা। কি যে ঝামেলা। শীতের কথা বলেও পর পেতাম না, যা হতো তা হলো…. পাশের লনে হারমোনিয়াম নিয়ে রোদের মধ্যে বসিয়ে দিতো!!
কি ভয়ানক দুষ্টুই যে ছিলাম। স্কুলের বাবু রহমান স্যার, গানের শিক্ষক, শুধু টিফিন খেয়ে ফেলতেন বলে একদিন অামি নুডলস টিফিন বক্স থেকে নিচে ফেলে মেঝের ময়লায় মাখিয়েছিলাম। তারপর স্যারকে বলেছি, স্যার আমার মামা বিদেশ থেকে মশলা এনেছেন, সেটা দিয়ে নুডলস রান্না করা হয়েছে, যেই বলা সেই কাজ….. স্যার পুরো বক্সের নুডলস সাবার করে দিলেন!!! আমার এহেন পারদর্শীতায় অনেকেই মুগ্ধ ছিল, বিশেষ করে স্যারের সাথে এধরনের কর্মকান্ডের ফলে….. যারা জানে তারা তো জানেই কেন স্যারকে আমরা কেউ পছন্দ করতাম না!! বিশেষ করে মেয়েরা….!! কিন্তু সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তিনি বিশেষ পারদর্শী সেটা স্বীকার করতেই হবে।
ক্যাম্পাসের সবাই আমরা জানি বাসার বাইরে বের হয়ে আমরা কেমন রাডার বাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতাম সবসময়; সে ছেলেই হোক কি মেয়ে। আমরা এ ধরনের নেটওয়ার্কের নাম দিয়েছিলাম… বিবিসি নেটওয়ার্ক!!! আমি আর বাবাই যখন টিফিন পিরিয়ডে স্কুলের সামনে রাস্তায় হাঁটতাম, গল্প করতাম, তখন একেকজন টিচার আসতেন আর অামরা খোলা রাস্তায় কই লুকাবো সেইটা খুঁজতে খুঁজতেই তারা দেখে ফেলতেন যে….. শিরীন আপার মেয়ে একজন ছেলের সাথে হাঁটছে। কি সর্বনাশের কথা!! এতো রীতিমতো ক্রাইম!!
এসএসসির ক্যামিষ্ট্রির প্র্যাকটিক্যাল, আমাদের প্রিয় রবিউল স্যার এক্সটার্নালদের সামনে হঠাৎ বলেন কি, গান শুনবেন নাকি? স্যার খুব কাব্য করে কথা বলতেন,অামাকে যারপরনাই ভালবাসতেন। বলেন, কি হে একটা গান হয়ে যাক? মজার ব্যাপার হলো, আমি যখনই হাসতাম শব্দ ছাড়া হাসতে পারতাম না, স্যার বরাবরই বলতেন, এই মেয়েটি কি সুন্দর ক্ল্যাসিক্যাল সুরে হাসে, এর হাসি তো আস্তে আস্তে উচ্চস্বরে উঠতে থাকে, একি রে বাবা!!! আজ স্যার নেই, কিন্তু স্যারের ভালবাসার স্মৃতিগুলো হঠাৎ আজই যেন মনে পড়ে গেল এগুলো বছর পরে!!!
সেলিম অাল দীন পত্নী, বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা ম্যাডাম….. একদিন শুনি টিচার্স রুমে অন্যদের বলছেন, এই যে ঈশিতা এত দুষ্টামি করে, কিন্তু সেই দুষ্টামিগুলোও কত বুদ্ধিদীপ্ত দেখেছেন? তখন একজন বললেন, কই আমি তো কিছু দেখালাম না। ওরা সবগুলাই বান্দর একেকটা…..অাপনি কি যে বলেন? কে বলেছিলেন? আমাদের বিশিষ্ট কোহিনুর ম্যাডাম….. !!! হাই ম্যাডাম ইরাদের পাশের বাসায় থাকতেন। কিছু হলেই শুধু থ্রেট দিতেন…. কি ইরাদ বাসায় জানে? হা হা হা…..
ফিজিক্স ম্যাডাম Masuma Sultana একবার এমন বকলেন সবার সামনে, বললেন… তোমার আর পড়াশুনা হবে না। যাও আপাকে বলো তোমার বিয়ে দিয়ে দিতে। কি অপমান…… রাগে, দুঃখে…… কি হলো…. ফিজিক্সে এ প্লাস পেয়ে গেলাম……. ম্যাডামকে এত্তগুলা ভালবাসি, জানি ম্যাপামও আমাদেরকে সেইরকমই ভালবাসেন….. পরীক্ষার ঠিক একমাস আগে জেসমিন বস Farida Jasmin পড়ানো শুরু করলেন আমাকে বাসায়…… এমনই মানৃুষ… আমি যদি বলি পড়া কমপ্লিট হয়নি, বলতো তোরে আরও ৩ ঘন্টা সময় দিলাম, আর সত্যি সত্যি রাত ১ টায় এসে এই মহিয়সী নারী আমার পরীক্ষা নিয়ে তবেই ছাড়তো!!! তার জন্যই আমি রেজাল্ট ভাল করতে বাধ্য হয়েছিলাম।
আর সারা বছর আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম কবে বছর শেষ হবে আর বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা শুরু হবে। আমার আর ঐশীর Ayeshi Shafique মধ্যে ছিল সেই কম্পিটিশন। নাম দিতে হতো কে কিসে অংশগ্রহণ করতে চায়, আমরা গোপনে নাম দিতাম। হা হা হা….. তারপর যেই জিজ্ঞেস করতো বলতাম, কই এবার তো আমি দিচ্ছি না। আর মনের সুখে বাসায় চলতো প্র্যাকটিস!! তারপর একসময় জানা যেন যে আমরা দুজনেই দিচ্ছি… তখন কোন গান দিচ্ছি, কোন গানে নাচ দিচ্ছি এরজন্য কত গোয়েন্দাগিরি যে চলতো!!! একবার ঐশীকে দরজা বন্ধ করে রেখেছিলাম কিছু করতে দিবো না বলে, ইফ্ফাত Iffat Hossain ছিল সেই দায়িত্বে, আমাদের ভেতর ওই ছিল একমাত্র শক্তিশালী!!! থ্রেট দিয়ে একটা ক্লাস রুমের ভেতর বসিয়ে রেখেছিল।….. সরি রে বান্ধবী…………………. Iffat Hossain ইফফাতকে সেই সময় ছেলে সাজিয়ে রবীন্দ্র কিংবা নজরুল জয়ন্তীতে নাচতে ভালবাসতাম। ওর বাসায় চলতো রিহার্সেল……. সে খানিকটা নাদুসনুদুস ছিল সেই সময়ে… চাচী এসে কিছুক্ষণ পরপরেই কিছু একটা বলতেন আর ইফু রেগে মেগে………. ইসরাত আপু Ishrat Hossain এসে তখন আার ঠিক করতো!!!
পারুল Dilshana Parul আপু…… আমার দীক্ষাগুরু! আমি তাকে অনেক ভালবাসি…… আমার নাচ কেমন হচ্ছে সেইটা আমি দেখতাম আপুর চোখে। তার চোখই বলে দিতো আমি কেমন…… কি যত্ন নিয়ে যে অামাকে নাচ তুলে দিতো….. কত ভালবাসা যে তার বোনদের কাছ থেকে আমি পেয়েছি সেইটা বলে বোঝানো যাবে না……. আমার একটা ভাল নাচ মানে যেন ঐ বাসার সবার জয়…….. কি ছিল সেইসব দিনগুলো……… আমার নাচ দেখার জন্য জায়গা নেই দেখে একজন সাহসী মানুষ একবার জানালাতেও উঠেছিল….. কে বলো তো? আমার মনে হয় সবাই জানে… নাম বলার দরকার নেই….. অাপুর নাচ দেখতাম আমি মুগ্ধ হয়ে…. সে কি মুদ্রা….সে কি ভঙ্গিমা!!!! সোমা অান্টি ( সোমা মুমতাজ) অামার প্রথম নাচের জাজ ছিলেন….নাচ শেষে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন……. তিনি সবকিছু বাদ দিয়ে আমার বিয়েতে এসে আবারও আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন… মেয়ের বিয়েতে না এসে থাকি কিভাবে?
আর মিতা চাচীর বাসায় গানের ক্লাসে আমাদের খুনসুটি পৃথিবীর সেরা….. চাচীর ধমক না খেলে অাজও যেন ভাল লাগে না। তাই না ‍Salma Sabiha Rodela Sukriti ?? রাত জেগে পোস্টার লেখা…রিহার্সেল করা, মাঝখানে গরম গরম সিঙ্গারা খাওয়া….. দল বেঁধে সবাইকে দাওয়াত দিতে যাওয়া…… আর যখণ ছোট ছিলাম তখন ছিলেন Farzana Chowdhury Bindu খালামনির বন্ধরা সবাই….. তখন গানের অনুষ্ঠান হতো বর্ষবরণ…….. আমাদের কচিকাচাদেরও ডাক পরতো রিহার্সেলে……… একবার অনুষ্ঠঅনের মাঝে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলো…সব উড়িয়ে নিয়ে গেল প্রায়….সবাই সামনের বাসায় ঢুকে বাকী অনুষ্ঠানটা শেষ করেছিল…….. কারেন্ট নেই তো কি হয়েছে ? সবার গলার সুরে যেন ঝড়ও সেদিন হার মেনেছিল…….
সুমনা আপুর Ismat Hossain হলুদে নেচে ফাটিয়ে দিবো এই প্রত্যয় নিয়ে ঈশিদের বাসায় সারারাত জেগে আমরা…… অামি আর এলিজা নাচ Farzana Sehrin তুলবো…… উত্তেজনা অন্যদের মধ্রেও তারাও বাসা থেকে চলে এলো…..ঈশি Farhana Sehreen Ishita আর ইফু মিলে খাবারের দায়িত্বে….. নৃত্যশিল্পীরা পরিশ্রান্ত হয়ে একটু পরপরই খেতে চায়…..তারা খাবার বানিয়ে গরম গরম পরিবেশন করে… সারারাত চললো সেই প্র্যাকটিস……. ভোররাতে আমরা যেই ঘুম দিলাম উঠলাম দুপুরবেলায়….. আর সিদ্ধান্ত নিলাম…. থাক ইসরাত আপুর বিয়েতে নাচবো…….এখন নাচের গেটআপ নিলে আমাদের হলুদের গেটআপ নষ্ট হয়ে যাবে বলে কথা!!!!!!
অাম্মু ছিলেন ছাত্রী হলের দায়িত্বে….. কি অসম্ভব ভালবাসা যে আমি শৈশবে পেয়েছি অনাত্মীয় সকলের কাছ থেকে! একবার অামার জন্মদিন পালন করলেন হলের প্রায় ৪০০ ছাত্রী….. কি উত্তেজনা….অামার বয়স ৩ বছর। তখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চলে ঢাকা যাবার জন্য। এক সপ্তাহ ধরে ক্যাম্পাসের প্রায় সবাই জেনে গেল আমার জন্মদিনের কথা….. সবাই আয়োজন…গিফট…..সব কিছু নিয়ে যেন মাতোয়ারা…… বিশাল হলঘরে সে কি আয়োজন…… ছবিগুলো স্মৃতি হয়ে রয়ে গিয়েছে….. সেই সময়ের যে কোন আন্টি ক্যঅম্পাসে রিইউনিয়নে আসলে আম্মুর সাথে দেখা না করে কেউ যেতেন না!! হলে ঢুকেই প্রথমে জানতে চাইতেন, ম্যাডাম আছেন? আর তন্বী? ত কত বড় হয়েছে? এমনও হয়েছে, কলিং বেল শুনে দরজা খুলেছি, আমাকে বলছে যে, আচ্ছা তন্বী কোথায়? তারপর তাদের উচ্ছ্বাস কোন ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়…….
আমার কাছে তারাই আমার আত্মীয়….. ক্যাম্পাসের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি মানুষই যেন আমার, আমাদের আত্মীয়!!! অামাকে অনেক অমূল্য বন্ধন দিয়েছে, দিয়েছে ভাল বন্ধু, বর……. জাহাঙ্গীরনগরের প্রতিটা কুয়াশা, তাপদাহ,ঝড় সব আমাদের দুজনকে চেনে…… আমাদের বন্ধুত্ব কে জানে….. সেই শিশুকাল থেকে স্মৃতিগুলো আজও অমলিন হয়ে রয়েছে…….
যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই –
যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।
এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই।
যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।
বিশ্বরূপের খেলাঘরে কতই গেলেম খেলে,
অপরূপকে দেখে গেলেম দুটি নয়ন মেলে।
পরশ যাঁরে যায় না করা সকল দেহে দিলেন ধরা,
এইখানে শেষ করেন যদি শেষ করে দিন তাই –
যাবার বেলা এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: