সুইজারল্যান্ডের আল্পস ও আমরা তিনজন

ইন্টারসিটি এক্সেপ্রেস বা ICE

লিওনেলের জন্মদিন! আমাদের একমাত্র পুত্রের জন্মদিনটি অন্যভাবে যদি করা যেতো! যেই ভাবা সেই কাজ। ঠিক করলাম মেঘের রাজ্য ছাড়িয়ে আরও অনেক ওপরে উঠে পুত্রকে অন্য এক পৃথিবী দেখাবো।ফ্র্যাঙ্কফুর্ট থেকে আইসিই তে চড়ে রওনা হলাম। আইসিই হলো ইন্টার সিটি হাইস্পিডের ট্রেন। জার্মানী ও26233256_10214399975534308_7153954667873374848_o তার আশেপাশের দেশগুলোতে সহজেই এতে চড়ে যাওয়া যায় এবং অবশ্যই অনেক কম সময়ে। খাবার জায়গাটি এত সুন্দর, যেন একটি অবচারভেটরি, চারপাশের অসম্ভব সৌন্দর্যকে উপভোগ করার প্ল্যান করিয়েই বানানো হয়েছে মনে হয়।এমনকি ফ্যামিলির জন্য নির্দিষ্ট কিছু কাঁচঘেরা কম্পার্টমেন্টও রয়েছে। পুত্র যত ইচ্ছা দুষ্টামি করতে পারবে এবং কেউ বিরক্ত হবার নেই দেখে আমরা যারপরনাই আস্বস্ত হলাম। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট থেকে প্রায় সাড়ে চার ঘন্টার মতো লেগেছে আমাদের পৌঁছতে।

আমাদের হলিডে অ্যাপার্টমেন্ট

এইবার সব কিছুই একটু অন্যভাবে করতে চাইলাম; তাই হোটেলে থাকার চিন্তা বাদ দিয়ে অ্যাপার্টমেন্ট বুকিং দেয়া হলো। HITRental সুইজারল্যান্ডের প্রথম সারির অ্যাপার্টমেন্টগুলোর ভেতরে অন্যতম। ভাবছেন তো যে বেড়াতে গিয়ে আবার অ্যাপার্টমেন্ট কেন রে বাবা? নিজেদের মতো থাকার জন্য এরচেয়ে ভাল উপায় আর কিছুই হতে পারেনা। কিভাবে? যেমন ধরুন, ছোট্ট পুত্রকে নিয়ে ভোরবেলা উঠে হোটেলের ব্রেকফাস্টের বালাই নেই, পুত্র অন্যদের সাথে দুষ্টমি করবে সেই ভয় নেই, আপনি চাইলেই যা মনে চায় নিজে তৈরী করে খেতে পারবেন, এমনকি পিকনিক স্টাইলে খাবার নিয়েও যেতে পারবেন,শুধু গরম করে খাওয়া আরকি। কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে রান্না করা- সবকিছুর ব্যবস্থাই রয়েছে এই সুউচ্চ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এ।আর ভিউটা যে অসম্ভব সুন্দর, সেটা আর বলার অপেক্ষাই রাখেনা। যাতায়াতও সহজ যেকোন টুরিস্টদের জন্য, একদম সামনেই যে বাসের বুথ! সিটি পাসের অফার দিলো, আমরা ভাবলাম বুঝি টিকেট বিক্রি করার ধান্দা করছে! না তো, এরা বরং তাদের গেস্টদের জন্য যাতায়াতের এই সুবিধাটি করে রেখেছেন, সিটি পাস দিয়ে আপনি যে কদিন থাকবেন শহরে যাতায়ার করতে পারবেন খুব সহজেই আর অবশ্যই এটি বিনামূল্যে!

চ্যাপেল ব্রীজ ও লেক লুসার্ন

DSC_0227১৩৩৩ সালে তৈরী চ্যাপেল ব্রিজটি রাতের অন্ধকারে একরকম; আবার দিনের আলোয় অন্যরকম। এই ব্রীজের সিলিং আঁকা রয়েছে অনেক ছবি, যেগুলো সতের শতাব্দীতে আঁকা হয়েছিল। সেখানে নাকি মোট ১৫৬ টি পেয়িঙটিং ছিল; কিন্তু  ১৯৯৩ সালে এই বীজটিতে নাকি আগুন লেগেছিল, যেখানে প্রায় বেশিরভাগ ছবি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। জেনে অবাক হলাম যে, লেক লুসার্ন এর বিশালDSC_0267.JPG জলরাশি আসে চারটা নদী থেকে, সরাসরি মো-ব্ল্যাঙক মাউন্টেন রেন্জ এর বিশাল গ্লেসিয়ার থেকে! কি যে সুন্দর লেকটি! আমার ছেলের পছন্দের কোয়াক কোয়াক ও আছে প্রচুর, মানে ধবধবে সাদা হংসের কথা বলছি আরকি! যখন সবগুলো পাখা মেলে একসাথে উড়ে যায়, তখন মনে হয় যেন এত উচ্ছ্বলতাও রয়েছে প্রকৃতিতে! আর যখন রাজহাঁসগুলো সাতার কাটতে থাকে, তখন তাদের পাখার শব্দে অন্য পাখিরা উড়ে যায়, হয়তো ভয় পেয়েই!

মাউন্ট রিগি ও ধোয়াশা কুয়াশা

পরদিন সকালে উঠে নাস্তা সেরেই তড়িঘরি করে বেরিয়ে পড়লাম মাউন্ট রিগি দেখতে। লঞ্চে করে যেতে হবে ক্যঅবল কার পর্যন্ত। লঞ্চ যেখানে নামালো সেখান থেকে  পাহাড়ে চড়ার ট্রেন। চারিদিকে শুধুই কুয়াশা! এবার ট্রেন পাহাড়ে চড়তে আরম্ভ করল। বোধহয় তিরিশ ডিগ্রির বেশী অ্যাঙ্গল. বাঁ দিকে লেক লুসার্ন ধপধপ করে নিচে নেমে যাচ্ছে। মাঝে  ছোট্ট স্টেশনগুলোতে মানুষ নেমে যায়! চারিদিকে নানা শেইপের বাড়ি! তার আরো খানিক পরে পৌঁছলাম রিগির মাথায়। এক চিলতে এক চিলতে দুটো প্ল্যাটফরম। একটা খাবার দোকান কাম স্যুভেনিরের দোকান। আর বাকিটা শুধু সাদা। চারিপাশে যত ট্রেল সব সাদা। কেউ কেউ খোঁচাওলা লাঠি নিয়ে ঠুকে ঠুকে হাঁটতে যাচ্ছে ওই ট্রেলয়ে। আমরা উপরের ভিউ পয়েন্টটায় উঠলাম অনেক সাবধানে। বারবার পা পিছলে যাচ্ছে! ওপরে উঠে খাওয়া-দাওয়া করে যখণ নামতে যাবো, বিশাল ভয় পেলাম যে এবার মনে হয় পাহাড় থেকে পড়েই অক্কা তুলতে হবে! না, সমাধান রয়েছে! নিচে নামার জন্য লিফট! কেন যে আগে খেয়াল করিনি এটা ভাবতে ভাবতে নিচে নামলাম! এরপর ফেরার পালা, এবার ক্যাবল কারে করে যাবো……. ছেলেটা আমার একটুও ভয় পায়না!!

মাউন্ট টিটলিস আর লিওনেলের কেক কাটা

ঠিক করেছিলাম পুত্রের জন্মদিনে আমরা মাউন্ট টিটলিসে উঠবো। ১০,৬২৩ ফুট উচ্চতায় উঠতে হবে এই ভয়ে আমি প্রায় জড়সড়, কারণ আমার ভয়াবহ অ্যাক্রোফোবিয়া আছে! উচ্চতা আমার বরাবরই ভয়ের বিষয়,অনেকবারই বোছার চেষ্টা করেছি, ভয়টা আসলে কেন হয়। আফসোস আজও বুঝি নাই এর কারণ!।মাউন্ট টিটলিসের মাথায় উঠলাম তিন ধাপে। প্রথম দুই ধাপে ছয় আসনের ক্যাবল কারে, আর পরের ধাপে বিশাল বড়ো ক্যাবল কারে, যেখানে বসার জায়গা থাকেনা। আমার ক্যাবল কার ভীতি সবসময়েই দেখার মতো। আগে পুত্র ছিলনা, বর আমাকে সাহস দিয়েছে। এইবার পুত্রসমেত যে কি হবে, সেটা ভেবেই আমি আগে থেকেই খুবই হতাশাগ্রস্ত ছিলাম। সমতলেই কারণ ছাড়া ধপাস করে পড়া আমার জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়, সেখানে যদি ওপর থেকে পড়ি তো গেলাম!  এইসব নানা চিন্তায় অস্থির হয়ে ক্যাবল কারের যাত্রা শুরু করলাম। লুসার্ন থেকে প্রায় এক ঘন্টার পথ পেড়িয়ে তারপরে ক্যাবল কারের যাত্রা শুরু করতে হয়। যত ওপরে উঠছি, ততই যেন চারিদিক স্পষ্ট হচ্ছে ! কি ভয়ঙ্কর সে সৌন্দর্য! নিচে-ওপরে, চারিদিকে শুধু সাদা আর সাদা আর মাঝে সুবিশাল নীল আকাশ। যারা গিয়েছে তাদের বেশিরভাগই স্কী করার জন্য। সাথে স্কীর সব সরঞ্জাম বগলদাবা করে ছোট-বড় সবাই উত্তেজনায় টগবগ করছে আর আমি অবাক চোখে তাদের সাহস দেখছি! যখন ওপরে উঠলাম, মেঘেরও ওপরে, নিচে সাদা মেঘেরা সব ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে! সত্যিই যখন সেই পাহাড়চূড়ায় পৌঁছলাম, মনে হচ্ছিল স্বর্গকে ছোঁয়া যাবে। দিগন্ত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে যেন একটা ধবধবে সাদা কার্পেট বিছানো। যে পাশেই তাকানো যাক না কেন, পুরু বরফের চাদরে ঢাকা। সেখানে তৈরি রয়েছে ‘আইস কেভ’ও।

26850343_10160159070275122_2224647918248099464_oস্থান নির্বাচন নিয়ে কিছুক্ষণ কোল্ড ওয়ার চললো পুত্রের বাবার সাথে।অবশেষে পুত্রের কেক কাটার জন্য একটা জায়গা ঠিক করলাম। সবাই স্কী করছে, তার ভেতরে বসে কেক কাটা একটা ব্যাপারই বটে! মানুষ জড়ো হয়ে গেল, যারা স্কী করছিল আশেপাশে, তারা খুব আনন্দ নিয়ে অামাদের পুত্রের আনন্দ দেখতে লাগলো। তারপর অনেক কষ্টে কোনমতে ক্যান্ডল ধরানো গেলা অবশেষে! কেউ কেউ কে হাতে পুত্রের ছবি তুললেন। তারপর আমরা তিনজন মিলে কেক কাটলাম। ছেলের সে কি আনন্দ যদি দেখতেন আপনারা! মন ভাল করে দেয়া মতো দৃশ্যই বটে! এরপর আরও ওপরে যাবার জন্য এগিয়ে গেলাম। পিতা পুত্র হাত ধরাধরি করে অনেক সামনে, আমি নাদুসনুদুস মানুষ নিজের ব্যালেন্স রাখারা চেষ্টাতেই ক্লান্ত! বর অামার কাছে থাকছে না, কারণ তিনি সিওর আমি নাকি চিৎপটাং হবোই, তখন তাকে ধরবো, তারা দুজনেও অবধারিতভাবে পড়বে, অগত্যা  কি আর করা আমি দাড়িয়ে গেলাম, না, আমার পক্ষে আর যাওয়া সম্ভব না।

যা ভয় পেয়েছিলাম তাই হলো, এত ওপরে ছেলের সমস্যা হতে শুরু করলো, বেচারা কাঁদতে লাগলো। তার নাক-মুখ সব লাল হয়ে গিয়েছে। তাকে নি েঅবজারভেটরিতে গরমে একটু বসবো বলে যেতে থাকলাম এবং ধরাম করে সশব্দে একটা আছাড় খেলাম! সবাই খুব আনন্দ পেল আমাকে দেখে, খুব হাসতে লাগলো আশেপাশের সবাই। আমিও যারপরনাই অানন্দিত সবাইকে ব্যাপক বিনোদন দিতে পারায়! মনে হলো যেন সারা শরীরের হাড়গোড় এই বুড়া বয়সে সব গেলই! কিন্তু, কিছুই হয়নি এইরক একটা ভাব নিয়ে উঠে আবারো হেঁটে চললাম।

রেস্ট নেয়া শেষে বর ঠিক করলো ব্রীজ দেখতে যাবে! কিসের ব্রীজ? এটি ইউরোপের সর্বোচ্চ সাসপেনশনbridge on the Titlis সেতু। ভাবুন একবার ১০,৬২৩ ফুট ওপরে একখান টলটলায়মান খাড়া ওয়াক সেতু! সেতুর দুলুনিতেই আপনাকে চলতে হবে আর যেতে হবে একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে।এটিকে তুষার ঝড় এবং চরম বাতাস প্রতিরোধ করার জন্য ডিজাইন করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত নিরাপদ। বিশ্বাস করুন, আমি তখন পুরাই অ্যাক্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত, আমার বর হাত ধরে টেনে নিতে চাইলেও পারলো না আমাকে নিতে। পিতা-পুত্রই গেল শুধু এবং পুত্র ভয়ে যখন কান্না শুরু করলো তখন কোলে করে ফিরলো। বাহবা দেবার মতোই, যেখানে নিজে হাঁটাই বিশাল বড় ব্যাপার, সেখানে পুত্রকে কোলে করে নিয়ে হাঁটা দুঃসাধ্য কাজ। আমার পাশ দিয়ে ৬-৭ বছরের ছেলেমেয়েরাও বাবা-মায়ের সাথে কি সুন্দর স্কী করতে করতে নিচে নেমে যাচ্ছে!!! ভাবতেই গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায় এখনও! ১০,০০০ ফুট ওপর থেকে স্কী করতে করতে নিচে নামছে!! একটু এদিক ওদিক হলেই অক্কা নইলে হাড়গোড় ভাঙ্গা!! কত গভীর খাঁদগুলো!! আমি অাসলেই হিংসা করলাম ওদের, জীবনকে উদযাপন করতে পারার যে আনন্দ তা থেকে বোধকরি আমরা অনেকেই বঞ্চিত শুধুমাত্রই সাহসের অভাবে! আমার মা অামাকে বৃষ্টিতে ভিজলে বকতেন জ্বর হবার ভয়ে, আর এরা কোথা থেকে কোথায় নামছে…….. বলিহারি সাহস!! বলাই বাহুল্য যে, ফিরে আসার সময় আমি আরও একবার সবাইকে আনন্দ দিয়ে আছাড় খেলাম। নিশ্চয়ই সেটিও অভূতপূর্ব দৃশ্যই ছিল।

যখন পেছনে ফেলে আসছি শ্বেতশুভ্রতাকে, মনটা কেমন যেন একটু বিষন্ন হলো! প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে কাছে পেয়ে নিজের ক্ষুদ্রতার বিষন্নতা!! প্রকৃতির বিশালত্বের মাঝে নিজের ক্ষুদ্রতা আবিস্কারের বিষন্নতা!

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: