তুমি….আমি আর বন্ধুরা

তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। বৃত্তি পরীক্ষার জন্য কয়েকজনকে সিলেক্ট করা হয়েছে যাদেরকে স্কুলের ক্লাস শুরু হবার আগেও স্পেশাল ক্লাস করতে হতো ভোর বেলায়। অতি আগ্রহ নিয়ে ঘুম থেকে উঠে ক্লাস বেশিরভাগ দিনই খানিকটা আগে পৌঁছে যেতাম। দেখতাম ক্লাসে আরেকজন ছেলেও প্রায়ই আগে আসছে। ছেলেদের সাথে বৈরীপূর্ণ মনোভাব ছোটবেলা থেকেই প্রকট;তাই এটা তখন থেকেই সর্বজন স্বীকৃত যে,

’’ঈশিতা নামের মেয়েটা ভয়ঙ্কর অহঙ্কারী; এমন ভাব যে মাটিতেই পা পড়েনা।’’

এইরকম প্রেক্ষাপটেই আমরা দু’জন প্রথম প্রথম কথা বলতাম না। তারপর হঠাৎ করেই আমি আর সে কথা বলি,ছোট্ট দু’জন মানুষ স্কুলের সামনে ক্লাসের সবাই আসার আগে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করি। আর যখনই তার মা ঐ রাস্তা দিয়ে অফিসে যেতেন,সে যেন আমাকে চিনতোই না এরকম ভাব করে মায়ের কাছে কথা বলতে চলে যেতো!!!

আমাদের শুরুটা এরকমই। আমার আর তোমার……

ক্লাস সিক্সে উঠলাম। শুরু হলো ঝগড়া পর্ব!! তুমি, ইরাদ এবং অন্যান্যরা বিচিত্র কারণেই আমাকে বিচিত্র সব কথা বলে েঅপমান করার চেষ্টায় নিজেদের জীবন সপে দিলে….যেমন: আমাকে সিমেন্টের বস্তা কথাটা যে ফজলুর রহমান স্যারের নাতিকে দিয়ে বলাতে…..!!!! কি আজিব!!! এই কাজে ইরাদের আনন্দের কোন কমতি ছিলনা!! ইরাদের ভাবটা এমন ছিল যে সে যেন মহা স্লিম!!! িএকদিন মনে আছে সারা ক্লাসে তুমি আর ইরাদ কি যেন শুধু বলো আর হাসো। তারপর একটা ক্লাসের ফাঁকে ইরাদ আমাকে জানালো যে, তোমাদের নাকি আমার সাথে খুবই জরুরী কথা আছে। ক্লাস শেষ হলে যেন থাকি। আমি তো মহা অস্বস্তির মাঝে আছি,না জানি আবার কি অপমান হতে হয়…ঝগড়া করতে হয়। তারপর…সবাই চলে যাওয়ার পরে বাবু আর ইরাদ শুধু হাসে!!! তারপর জানা গেল জনৈক ‘অ’ নাকি আমার প্রেমে পড়েছে!!! আমার স্পষ্ট মনে আছে,তখন আমরা ক্লাস ফাইভে পড়ি!!!

এই জনৈক ‘অ’ এর সাথেই বাবু প্রথম আমাদের বাসায় গেল!! ‘অ’ এর শুভ জন্মদিন তাই আমার দাওয়াত।আমাদের বাসায় ঢুকে ইরাদের হাসি যেন থামতেই চায়না!! এভাবে নানা ঘটনায় দিন গড়ালো। সারাক্ষণ ঝগড়া করেও কিভাবে কিভাবে যেন এক  সময় আবিষ্কার করলাম আমি আর তুমি সেই ক্লাস সিক্স থেকেই টিফিন পিরিয়ডে তাড়াতাড়ি বাসা থেকে কোনরকমে খেয়ে চলে এসে ক্লাস শুরু হবার আগ পর্যন্ত একসাথে হাঁটতাম!! আমি যে কত কথা বলতে পারতাম !!! তুমি ছিলে শ্রোতা এবং অত্যন্ত ভালো একজন শ্রোতা যে আমার সব আবোলতাবোল কথা একনিষ্ঠভাবে শুনে যেতে!!

তারপর যতই বড় হয়েছি হাঁটার পরিধি বেড়েছে। আগে স্কুলের সামনের একটুখানি রাস্তা, তারপর স্কুলের সামনের যাত্রী ছাউনী, তারপর ভিসির বাসা….এভাবে করে আমাদের রাস্তা দিনদিন বেড়েছেই।যখন বড় হলাম,আমাদের ক্যাম্পাসে মোটামোটি আমরা জনপ্রিয় হয়ে গেলাম এইভাবে যে,

‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই দেখতো,স্কুল ড্রেস পড়া দু’জন রোদ,ঝড়,বৃষ্টি,শীত সব সময়েই শুধু হাঁটতেই থাকে আর পাশের মেয়েটা বকবক করতেই থাকে।মাঝে মাঝে মেয়েটা রেগে গেলে ঝগড়া করে…মারামারি করে!! তারা ক্লাসে যাওয়ার সময়ের আমাদের দেখতো; আবার ক্লাস শেষ করে আসার পথেও আমাদের দেখতো!!‘‘

তখন বয়সটা এমন যে,দু’জন ছেলেমেয়ে একসাথে থাকা মানেই যেন গর্হিত অন্যায় কাজ!! আর তাই ক্যাম্পাসের কিছু মানুষ এই বিষয়ে নানা চিন্তা ভাবনা শুরু করলো;কথা বলাবলি শুরু করলো!! আমি বরাবরই ডেয়ারিং…..কারও তোয়াক্কা করি না একমাত্র মা ছাড়া!!! আর আম্মু তো বাবুকে সবসময়েই পছন্দ করে। শুধু আম্মু না,বাবুকে আসলে  সবাই পছন্দ করতো। বাবু হলো আমার উল্টা…..আমাকে সবাই অপছন্দ করতো আর ওকে অনেক পছন্দ করতো!!

আমাদের এই দীর্ঘ হাঁটাহাঁটি আর আজকের এই পর্যন্ত আসার পেছনে অবশ্যই ঈশি, ইফু, ঐশী আর আমার ইরাদ বন্ধুর অবদান অনেক। বিশেষ করে ইফু আর ঈশি ছিল আমার লাইফ জ্যাকেট!! আমরা যখন দুপুরের রোদে হাঁটতে হাঁটতে সময়ের তোয়াক্কা করতান না; ঠিক তখনই আমার মা তাঁর একমাত্র মেয়ের চিন্তায় অস্থির হয়ে আমার অতি প্রিয় দুই বান্ধবীর বাসায় ফোন দিতেন। ঈশিকে ফোন দিলে সে বলতো,

চাচী ও তো আমাদেরই বাসায়। এই একটু পড়েই চলে আসবে।

বলেই বাসায় যেই থাকতো তাকে সাইকেল দিয়ে পাঠাতো রাস্তায় রাস্তায় আমাদের খোঁজে!! সে এসে বলতো,

আপু এখ্খনই বাসায় যান, খালাম্মায় আপনেরে খোঁজে।’

এইটা সেই যুগ যখন মোবাইল ছিলনা…..কী প্রোকেশনে ছিলাম বন্ধুদের। ধরা খেতাম ভালভাবেই আম্মুর হাতে….কারণ আমার মহা চালাক মা পরপর দুইজনকেই ফোন করতো; আর তারা দু’জনেই মাঝে মাঝে একই কথা বলতো!! আমি একজন মানুষ, কিন্তু আম্মু জানতো আমি একই সময়ে দুইজনেরই বাসায় থাকতে পারি!!! কী ক্ষমতা আমার!!!

আমি আসলেই জানতাম না যে ভালবাসা আসলে কী! ‍সবাই জানতে চায় ওকে কি আমি ভালবাসি? আমি বুঝতে পারিনা। শুধু এইটুকুই বুঝি ওর সাথে দেখা না হলে, কথা না হলে কিছুই ভালো লাগেনা।আর ও? তার বাসা ফোন ছিল না। সে কি করতো, ক্লাবে ফোন ছিল, সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সুযোগ বুঝে আমাকে ফোন করতো।আর আমি তো আমার স্বভাব মতোই কথা বলতে শুরু করতাম!! বেচারা….কী ফাপড়েই না থাকতো তখন!!! বলতেও পারতো না ফোন রাখা উচিৎ আবার……..

এই ছোট ছোট ভাল লাগা…..খুব ছোট ছোট কিছু প্রাপ্তি যেন আরও বেশি করে তোমার ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে।

আমি এখন জানি ভালবাসা কী।

ভালবাসা হলো….মাঝরাতে দু’জনে মিলে উঠে রান্না করে খিচুরী খাওয়া: ভালবাসা হলো… রাত দশটায় ঢাকা শহরে ভালো ইলিশ মাছ রান্না খুজে বেড়ানো; ভালবাসা হলো…. আমার অনেক বড় চিঠির উত্তরে একটি বাক্য লেখা; ভালবাসা হলো…দু’জনাতেই ডায়েটের প্ল্যান নিয়ে ১০’’ পিজ্জা খাওয়া………………… ভালবাসা হলো তুমি আর আমি…….।

আমরা দু’জন বিয়ের তিন বছর পার করতে যাচ্ছি। আমার প্রিয় বন্ধুদের এটাতে অবদান অনেক….সকল অন্যায়েও তোরা আমাদের সাথে ছিলি………………সব পরিস্থিতিতেই তোদের পাশে পেয়েছি…… যখন বিয়েতে সাজতে যাওয়ার সময় কাউকে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য পাওয়া যাচ্ছিল না,তখন তোরাই পরম আত্মীয় হয়ে আমার পাশে ছিলি…….তোরা নিজেদের সাজ বিসর্জন দিয়ে শুধু আমার সাজকেই গুরুত্ব দিয়েছির;ঐশীর মতো করিসনি……..হিহিঃ………….

তোদের সবাইকে ভালবাসি….আর আমাদের এই তিন বছর পূর্তিতে তোদেরকে মিস করছি…..

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: