নীরার জন্মদিন!!

ঘড়ির কাটাটা যত এগিয়ে অাসছে, নীরার মনটা ততই বিষন্ন হয়ে যাচ্ছে। ঘড়ির কাটাটা বারোর ঘরে গেলেই তার জন্মদিন শুরু!! একসময় কত উত্তেজনা ছিল সারা মাস জুড়ে!! কতগুলো উইশ পাবে সে, তার সবচেয়ে কাছের মানুষটা কিভাবে তাকে এবার সারপ্রাইজ দিবে; এরকম কত চিন্তা, কত উত্তেজনা থাকতো পুরোটা মাস জুড়ে। আজ সে বিষন্ন। সে ভাবছে, পুরোটা জীবন ভরে যা পাওয়ার কথা ছিল, তা মনে হয় একেবারেই সে পেয়ে গিয়েছে। তাই প্রাপ্তির কোঠাটা আজ শূন্য। আর যোগ হওয়ার সম্ভবনাটাও আজ নেই!! 

পাশের ঘরে তার প্রিয় মানুষটি বসে রয়েছে। টিভি দেখছে। ঘড়ির কাটাটা বারোটা ছুঁয়েছে। ফেসবুকের 67ad0acd26105566cfa730f8820cde04ওয়ালে ভরে গিয়েছে উইশে। নাহ, দরজা খুলে কেউ এলো না নীরার ঘরে। নাহ, কোন কেক বা সারপ্রাইজও নেই আজ!! নীরার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। মনে হলো, যদি চিৎকার করে সে কাঁদতে পারতো। অন্তত তার মনটা তো কিছুটা হালকা হতো। ওয়াইনের গ্লাস হাতে নিয়ে সে তার প্রিয় ব্যালকনিতে গেল। বসে গাঢ় কালো আকাশের দিকে চেয়ে রইলো। আরও বেশি করে যেন শূন্যটা তাকে জড়িয়ে ধরলো। সে ভাবছে, কি মানে এই জীবনের যদি প্রিয়জনকেই সে পাশে না পায়। তার উঁচু ব্যালকনি থেকে প্রায় পুরো শহরটাই দেখা যায়। ঘুমন্ত এই শহর। তারই মাঝে মাঝে দু-একটা লাইট জ্বলে আছে কোথাও। কে জানে তারারও হয়তো তারই মতো নিঃশব্দতা, নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করেছে, হয়তো গাঢ় কালো আকাশের কাছে নিজেদের হতাশাটুকু ছড়িয়ে দিতে চাইছে!! 

ধীরে ধীরে অাকাশের অন্ধকার কেটে যেতে শুরু করলো। নীরার হঠাৎ মনে হলো, তার কি করা উচিৎ? মন খারাপ করে সে হতাশায় ডুবে থাকবে সারাটা দিন নাকি নিজের মতো করে স্মৃতিগুলোকে আবার তাজা করে তুলবে? হেরে যাওয়ার নাম তো জীবন নয়!! আর সত্যিকার ভালবাসায় শুধুই নির্ভরতা আর মমতা যেন শিকঢ় গেঁড়ে বসে থাকে। আইসল্যান্ডে আজ খুব ঠান্ডা পড়েছে। জলদি করে সে পায়ে কেডস পড়ে নিয়ে দরজা খুলে বের হয়ে পড়লো। মনটা ফুরফুরে লাগছে নীরার। সে একা একা অনেক দূর পর্যন্ত হাঁটলো। ফেলে আসা স্মৃতির সিন্দুক খুলে নেড়েচেড়ে দেখলো। মনটা যেন  স্নিগ্ধতায় ভরে গেল। তার প্রিয় মানুষটি এই দিনে তাজা স্নিগ্ধ গোলাপ নয় রজনীগন্ধা দিয়ে উইশ করতো। সে ঠিক করলো গোলাপ কিনবে। দোকানীরা এখনও দোকান সাজাচ্ছে। তার মাঝেই একটা তোড়া সে তুলে নিল নিজের জন্য। নিজেকে সে আর নীরা ভাবছে না। ভাবছে সে তার প্রিয় মানুষটির হয়েই তো নীরার জন্য আজকের দিনে তার প্রিয় ফুল কিনতে এসেছে নীরাকে চমকে দিবে বলে!! ফুলগুলো কিনে রাস্তা দিয়ে আপনমনে হেঁটে চললো সে।

বাসায় ফিরে প্রিয় মানুষটির জন্য খাবার তৈরী করলো। অফিসে খাবে সে, তাই আজকে একটু স্পেশাল কিছু করবে কি সে? তাড়াতাড়ি করে একটু ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন ভেজিটেবল বানিয়ে ফেললো। আহ্, গন্ধটা তো বেশ হয়েছে। কে জানে, খেয়ে আজ ওর ভাল লাগবে তো? নাকি কোন না কোন একটা খুঁত আজও বের করে ফেলবে ঠিক!! হোক গে, কি বা আসে যায় তাতে। আচ্ছা অফিসে বের হবার সময় কি অন্তত একবার উইশ করবে না তাকে? ধুকপুকে বুকে অপেক্ষা করতে করতেই বেরিয়ে গেল সে। নীরার সমস্ত শরীর চাড়িয়ে যেন কলকল করে বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল! চিৎকার করে কেঁদে উঠলো সে, তার কান্নার সাথে ক্ষোভ, হতাশা, অপ্রাপ্তি, আশা সব যেন ধুঁয়ে যেতে লাগলো।ধুঁয়ে তো ফেলতেই হবে, নইলে সে আবারও উঠে কিভাবে দাঁড়াবে? হঠাৎ মনে হলো, একটা কেনও কেন কিনি না? যেই ভাবা সেই কাজ। চকলেট ফ্লেভারের বড় একটা কেক কিনলো। শপিং মলে গিয়ে সে একটা ইয়ারিং ও কিনে ফেললো। 

বাসায় ফিরে টেবিলে কেক সাজিয়ে রাখলো, ফ্লাওয়ার ভাসে গোলাপগুলো আর ছোট্ট এক জোড়া ইয়ারিং পাশে রাখলো। ভাবছে, আজও যদি তার প্রিয় মানুষটি আগের মতোই থাকতো, তবে এভাবেই তো তাকে সারপ্রাইজ দিতে চাইতো, এভাবেই সাজিয়ে রাখতো সব কিছু। ঠিক আগের সময়গুলোর মতো করে!! অদৃশ্য সেই প্রিয় মানুষটিকে পাশে নিয়েই সে কেক কাটলো, দুল জোড়া কানে পরলো আর মনে মনে বললো, ভালবাসি তোমাকে,খুব ভালবাসি। 

নীরা অপেক্ষা করে…… স্মৃতিগুলো ঝাপা হবার আগেই অাবার ফিরে আসে সেই সুন্দর স্মৃতিগুলো তার জীবনে, সেই অপেক্ষায়….. তার ভালবাসার কি জয় হবে না? তার এই অপেক্ষার কি শেষ হবে না? আচ্ছা, পরের জন্মদিন পর্যন্ত কি সে বেঁচে থাকবে? কে জানে!! নাকি এভাবেই অতৃপ্ততা নিয়ে মরে যেতে হবে নীরাকে? আচ্ছা নীরা মারা গেলে কি কষ্ট হবে তার? অাজকের দিনটির কথা ভেবে? 

অপেক্ষা কি শেষ হবে নীরার? শুনতে কি পারবে সে, শুভ জন্মদিন নীরা!!! 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: