এবার বার্সেলোনাঃ যাত্রা শুরুর সংকট

অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম কাতালোনিয়ার রাজধানীটা একবার ঢু মেরেই আসি। আমরা বার্সা পরিবার! কিভাবে? আমরা লিওনেল মেসির এমনই ভক্ত যে, আমাদের পুত্রের নামও তাই লিওনেল রেখেছি!! তাই একবার ঘুরে না আসলেই নয়। যেমন ভাবা, তেমনিই কাজ। আমাদের খুব প্রিয় ভাই ও ভাবী আর তাদের ছোট্ট রাজকন্যাকে নিয়েই প্ল্যান শুরু করলাম। তাই আমাদের টিমে এবার দু’জন ছোট্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ সদস্য লিওনেল আর ইবাদা।

স্কাইপে বসে আমরা দুই পরিবার হোটেল পছন্দ করলাম; এমনকি হোটেলের বুকিং, এয়ার টিকেট সবই অনলাইনে একসাথেই কিনে ফেললাম। ‍তুমুল উত্তেজনা বাসায়। এতদিন শুধু টিভির স্ক্রীনের বার্সার মাঠ দেখা হয়েছে আর এবার একদম মাঠেই উপস্থিত হবো আমরা!! গোছগাছ চলছে; একদিন আগে সন্ধ্যায় হঠাৎ ই-মেইল আসলো যে, আমাদের ফ্লাইট নাকি ক্যান্সেল হয়েছে এবং তারা দুঃখিত!! মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো; হোটেল বুকিং করা, মে মাসের পিক সিজনে হোটেল বুকিং ক্যান্সেল করলে টাকাতো পুরোটাই গচ্চা! এখন উপায়? এদিকে আবার ইবাদাকে নিয়ে ভাইয়া আর ভাবী হাসপাতালে!!ছোট্ট রাজকন্যা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কোন সিদ্ধান্তও নিতে পারছি না। বাসায় নতুন করে আবার উত্তেজনা; এবার অবশ্যই যাওয়া আদৌ হবে কিনা বা কিভাবে সম্ভব হবে বা ইবাদা কি যাওয়ার আগে সুস্থ হবে বা অসুস্থ ছোট্ট মানুষটাকে নিয়ে গেলে ওর শরীর আরও খারাপ হবে না তো এরকম হাজারটা কারন নিয়ে।

আমার বর অবশ্যই বসে না থেকে সময়টা কাজে লাগালো। আমাদের ফ্লাইট এর কোম্পানির সাইটে গিয়ে অনলাইনে যোগাযোগের চেষ্টা করলো আর নিজেও একই দিনে আরও কোন ফ্লাইট রয়েছে কিনা সেটাও খুঁজতে লাগলো। মাঝেমাঝে ভাইয়ার সাথেও ফোনে আলোচনা করতে থাকলো। আমাদের ফ্লাইট ধরার কথা ছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট মেইন এয়ারপোর্ট থেকে। এটিই আমাদের বাসার কাছে। কিন্তু দেখা গেল ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আর কোন ফ্লাইট নেই সেদিন!! কি বিপত্তি!! আমি খুব আশ্চর্য হয়ে দেখলাম অনলাইনেই ওরা চ্যাটের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করলো। আমরা সেদিনেই, তবে সকালে অন্য ফ্লাইটের টিকেট পেলাম। এই ফ্লাইট ধরতে হলে আমাদেরকে বেশ খানিকটা দূরে বাসে করে যেতে হবে এবং বার্সেলোনাতেও মেইন এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করবে না!! সেই এয়ারপোর্ট নাকি শহর থেকে বেশ দূরেই। প্লেন থেকে নেমে নাকি আবার বাসে করেই যেতে হবে মূল শহরে। মেজাজ খুবই খারাপ। খরচ তো বেড়েই চলছে বিনা কারনে!!

বাবাই (আমার বর) জানতে চাইলো, তোমাদের কারণে যে আমরা এত সমস্যায় পড়েছি তার কি হবে? দু-দু’বার বাস নিতে হবে। এখন সেই বাসের টিকেট পাবো কিনা তারও নেই ঠিক!! তোমাদের কারণে ঝামেলা!!

ওরা জানালো, তোমাদের এয়ারপোর্টে আসার জন্য এবং বার্সেলোনাতে গিয়ে বাসে মূল শহরে যেতে যে বাড়তি খরচ হবে সেটা আমরা দিয়ে দিবো। তোমরা শুধু তোমাদের  বাসের টিকেটগুলোর স্ক্যান কপি ই-মেইল করে দিও।

কেল্লাফতে!! এবার একটু নিশ্চিন্ত!! তবে এদের যা মতিগতি, প্লেনে না ওঠা পর্যন্ত কিছুই বলা যায় না।

যাত্রা শুরুর দিন খুব ভোরে বাসা থেকে বের হলাম। ফ্রাঙ্কফুর্টে এ বাসে গিয়ে ভাই-ভাবীর সাথে একত্র হলাম। হান এয়ারপোর্টটা আমার পছন্দই হয়না। এরা গতবার আমাদের কসমেটিকস মানে লিকুইড যেগুলো অারকি, সব ফেলে দিয়েছিল!! এবার তাই কিছুই নেইনি। ঠিক করেছি সব ঐখানে গিয়েই কিনবো, অন্তত এয়ারপোর্টে ঝামেলা তো হবে না। কিন্তু এবার বিপত্তি বাঁধালো আমার হিজাব। আমাকে পাশে নিয়ে হিজাব ভাল করে করে চেক করলো, জুতো খুলালো, কি আর বলবো। সবাই এমনভাবে তাকালো যেন, এই তো পেয়েছি মুসলিম টেররিস্ট!!! আর অন্য যাত্রীরা এমন ভাব করতে থাকলো, হায় হায় এই মুসলিমদের জন্য একটু অানন্দ নিয়ে বেড়াবারও উপায় নেই!!! এদিকে যখণ আমি মাথা গরম করে নিরুপায় হয়ে চেকিং এ বিপর্যস্ত, ঐদিকে ভাবীকেও নাজেহাল করে ফেলেছে ডেকে নিয়ে। কেন? তারা নাকি বাচ্চার খাবারের স্ক্যান করবে!! এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের এর আগে কোনদিনও হয়নি এয়ারপোর্টে। যাক, কি আর করা।

Webp.net-resizeimage (1)একসময় উড়োজাহাজটি আমাদের নিয়ে উড়াল দিলো এবং বলাই বাহুল্য যে, ল্যান্ডিং এর সময় অত্যন্ত বাজে অভিজ্ঞতার শিকার হলাম আমরা যাত্রীরা!! কি আর বলবো, দূর্ভোগ কেন যে শেষ হচ্ছে না এটা নিয়ে আমি বেশ চিন্তিত হয়েই বার্সেলোনার মাটিতে পা রাখলাম এবং বাতাস যেন আমাদের গোবরের গন্ধ দিয়ে স্বাগতম জানালো!! একি অাজিব!! প্রায় ক্ষেতের ভেতরেই মোটামোটি বড় একটি এয়ারপোর্ট; এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই বাস রয়েছে। সবাই এই বাসে করেই তাদের গন্তব্যে রওনা দিলো। প্রায় এক ঘন্টার যাত্রা। আমরা ক্লান্ত এবং ক্ষুধায় বিপর্যস্ত। এরই মধ্যে আমি খুঁজছি গোবরের গন্ধের উৎস; হু! পাওয়া গেল অবশেষে!! বিশাল বড় একটি ফার্ম!!

অবশেষে যাত্রা আংশিক শেষ করলাম। বার্সেলোনার বাস টার্মিনালে নামলাম। এবার পাতাল ট্রেনে করে হোটেলের পথে যেতে হবে। বলাই বাহুল্য যে, গুগল ম্যাপ আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো। বার্সেলোনার পাতাল ট্রেন এর ব্যবস্থাপনার সাথে জামার্নির মিল নেই বললেই চলে। তাই ট্রেন এর সময়সূচী ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখতে পেলেও, কোন ট্রেনটি আমাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যের কাছাকাছি গবে সেটি বুঝতে বিশেষ বেগ পেতে হচ্ছিল!! তারওপরে আবার নিচে নামার পর মনে হলো বাতাসও কম, প্রচন্ডbarcelona-metro গরম বাইরের তুলনায়!! ভাবছিলাম এখনই এই রকম অবস্থা, যখন অনেক গরম থাকে তখন না যেন মানুষ হিট স্ট্রোকই করে ফেলে!! ভেতরের ভেন্টিলেশন সিস্টেম খুব একটা অাধুনিক নয়, হয়তো পুরোনো বলেই!! শুধু তাই নয়, দেখলাম বাচ্চাদের স্ট্রলার বা ভেগেন বা বৃদ্ধদের হুইলচেয়ার নামানোর জন্য তেমন কোন সুবিধা নেই; মানে লিফটের ব্যবস্থা তেমন ভাল নয়। কোথাও লিফট আছে, আবার কোথাও নেই। যেখানে নেই সেখানে দূর্ভোগেরও শেষ নেই; সিড়ি দিয়ে বাচ্চাসমেত ভেগেন নিয়ে নামার যে পরিশ্রম, সেটি আসলে একসময় আমাদের আক্ষেপ আর রাগের কারন হয়ে দাঁড়ালো!! তবে অনেকেই আমাদের ভেগেন নিয়ে নামতে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল অনেকবারই!! যাক মানুষগুলো তাহলে নেহাত খারাপ নয়। এদিকে ক্ষুধায় পেট চো চো করছে!! বেলাও বেড়েই চলেছে। অবশেষে পৌঁছলাম বার্সেলোনার মূল বানহফে ( ট্রেন স্টেশন)।  বার্সেলোনার মূল টার্মিনাল অবশ্য পুরোদস্তুর আধুনিক; ঝকঝকে টাইলস করা মেঝে, ঝকঝকে দোকানপাট!! সেখান থেকে আমাদের হোটেল পায়ে হেঁটে মিনিট পাঁচেকের পথ। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। পুরো রাস্তা জুড়েই প্রচুর খাবার দোকান, স্প্যানিশ খাবারের গন্ধ নাকে যেতেই যেন ক্ষিধেয় মাথা খারাপের জোগাড় হলো ।হোটেলে যেতে যেতে আলোচনা করলাম, এখনই খেয়ে যাবো নাকি ফ্রেশ হয়ে তারপর এসে খাবো। অবশ্য আমি আর ভাবী ভাবলাম যে, আমরা এতই ক্লান্ত যে আমাদের এখন বের হওয়া উচিৎ হবে না। বরং ভাইয়া আর বাবাইকে পাঠাই খাবার রুমে নিয়ে আসার জন্য আর এরই মধ্যে আমরা বাচ্চাদের ফ্রেশ করাই আর নিজেরাও একটু ফ্রেশ হই!! হোটেল রুমে ঢুকেই জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম, অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। আহ্, বার্সেলোনা, স্প্যানিশ খাবার, ন্যু ক্যাম্প, বীচ, সবকিছু যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে!! আর আকাশে মেঘের ঘনঘটা যেন আমাদের মনকেও ছুঁয়ে গিয়েছে। ভাবছি এই বৃষ্টির ভেতরে বের হতে পারবো তো, বৃষ্টি কি কমবে নাকি আমরা এর ভেতরেই বের হয়ে যাবো নাকি হোটেলেই বাকি দিনগুলো জানালা দিয়েই বার্সেলোনা দেখেই কাটিয়ে দিতে হবে!! দেখা যাক……

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: