একদিন…. অনেকদিন…. ২০১৮ এর কথা

আমি ঠিক করেছি আমার ডক্টরাল শিক্ষাসময়ের শুরু থেকে প্রতিটা অভিজ্ঞতা লিখে রাখবো। কিন্তু, অনাকাঙিক্ষত কঠিন অসুখ, সংসার, সন্তান আর প্রফেসরের চাপের মুখে চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছি বলে আর কিছুই লেখা হয়ে ওঠে না।

শুরুটা হয়েছিল গত বছর। নতুন দেশ,নতুন ক্যারিয়ার চিন্তা আর নানা ঝড়ঝাপটার ভেতর মনে হলো হারিয়েই যাচ্ছি।  কেউ পাশে নেই বলার জন্য যে, নিজের ওপর ভরসা রাখো, ভেঙ্গে পড়ো না। দেশে নিজের ক্যারিয়ারের প্রায় ৮ বছর পার করে যখন তুঙ্গে আমি, তখনিই এখানে আবার নতুন করে পথচলা শুরু করাটা বোধহয় ততটা সহজ ছিল না।

অসাধারণ ভাল দেশ। একটি প্রধান সমস্যা হলো এর ভাষা। ডয়েচ না জানলে কারও গতি নেই। তাও যা আইটি দের গতি হয়। কিন্তু আমাদের মতো সমাজ গবেষকদের সেই আশাও নেই। এদিকে বাসায় ছেলেকে একা রেখে ভাষা কোর্সে ভর্তি হওয়াও তখন সম্ভব ছিলনা। ছেলের পেছনেই সারাদিন সময় চলে যায়। ল্যাপটপ খোলার সময় আর উৎসাহ পাই না। তার মধ্যেও মনে হলো, এভাবে হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না। তখন থেকেই চেষ্টা শুরু করলাম আমি।

ছেলে একটু ঘুমালেই ল্যাপটপ খুলে খুঁজতে শুরু করেছিলাম কোথায় কোথায় ইংরেজিতে আমি পিএইচডি এর জন্য আবেদন করতে পারবো। আমার পছন্দ মতো টপিকে কাজ করেন এমন কোন প্রফেসরকে খুঁজে বের করাও যেমন কঠিন, আবার পেলে দেখা যায় ডয়েচ জানা আবশ্যক। একটা ক্রায়টেরিয়া মেলে তো আর একটা মেলে না। কতজনের কাছে ই-মেইল করতেই থাকলাম। কেউ আমার টপিক নিয়ে আগ্রহ দেখায় না। বা দেখালেও নানা ঝামেলায় সেটা আর এগোনো যায় না।

এভাবে করে একজন প্রফেসর আগ্রহী হলেন আমার টপিকের ওপর। গত বছররের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শুধু টপিক নিয়ে অগনিত ইমেইল আমাদের মধ্যে!! আমি প্রায় প্যানিক হয়ে গেলাম। এ কি রে বাবা!! এই সামান্য বিষয় নিয়েই এত চিন্তা!! তারপর এপ্রিলে গেলাম ইন্টারভিউ দিতে। মাথা প্রায় ব্ল্যাঙ্ক। ‍কি বললাম আর কি শুনলাম সবই মাথার ওপর দিয়ে গেল। তবে বুঝলাম আমার হিজাব করা তার পছন্দ নয় একেবারেই। ইন্টারভিউতে প্রশ্ন করলেন, কিছ মনে করো না, তোমাকে কি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?

আমি বললাম, হ্যাঁ।

তুমি হিজাব কেনো পরো? আগে তো মনে হয় পরতে না। এখন হঠাৎ কি মনে করে?

এই প্রশ্নের জন্য আমি তৈরী ছিলাম। কিন্তু ধর্ম বিষয়ে আমি কাউকে জ্ঞান দিতে চাই না। এমনকি আমার জানাশোনাও কারও সাথে শেয়ার করতে চাই না। তাই আংশিক উত্তর দিলাম।

উনি বললেন, তুমি কি জানো এই হিজাবের কারণে তোমাকে নানাভাবে সমস্যায় পড়তে হতে পারে?

তাই? কিন্তু জার্মানির দ্বিতীয় বৃহৎ পপুলেশন তো মুসলিম!! রাস্তায় বের হলে ৪ জনের ভেতরে অন্তত ২ জনকেই কোন না কোনভাবে হিজাব পরতে দেখা যায়। তবে?

তোমাকে হিজাবের ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই। আমি আশা করি, এর পুরোটাই তোমার জানা। কিন্তু তুমি ভাল করেই বুঝতে পারো, পরিচিতি নির্মানের এই রাজনীতির কারণে তোমাকে কর্মপরিসরে বহুভাবে স্টেরিওটাইপ করা হবে যা তোমার জন্য সমস্যাজনক হবে।

এভাবেই প্রায় তিন ঘন্টা ধরে চললো কথা।

তারপর শুরু হলো প্রপোজাল লেখার কাজ। বারো পাতা লিখতে গিয়ে জান বের হয়ে যাওয়ার অবস্থা। বইপত্র কিছুই নেই কাছে; লাইব্রেরির বই ডয়েচে লেখা।তারওপর কাজটা পলিসি নিয়ে; তাও আবার জার্মান পলিসি!! কিছুই জানি না প্রায়। প্রথমবারেরটা পড়ে উনি বললেন, উই শ্যুড টক। তারপর যা দিলেন আমাকে ওটা ছিল প্রথম ডোজ!! আমি কাঁদতে কাঁদতে শুনে গেলাম আর বুঝলাম আমি একটা অপদার্থ!!

নিজের ওপরে তিরস্কার করে তীব্র অপমানে কাটালাম পরের কিছুদিন। তারপরে আবার নতুন উৎসাহে কাজ করতে নেমে গেলাম। রাতে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে ছেলের পাশে বসে ল্যাপটপ খুলে পড়াশুনা। এক হাত ছেলের গায়ে, আরেক হাত ল্যাপটপের কীপ্যাডে!! অনেক কষ্ট করে আবার নতুন করে প্রপোজাল লিখলাম।  প্রফেসরকে ভয়ে ভয়ে ই-মেইল করলাম। লিখলাম, এইবারেও যদি আমার সম্বন্ধে তোমার একই কথা মনে হয় তাহলে তোমাকে আর মেইল করবো না।

প্রতিদিন ইমেইল চেক করি। ইনবক্সে সেই মেইল আর আসেই না। তারপর আবার মেইল, উই শ্যুড টক। আমি আবারও কাঁদবার প্রস্তুতি নিয়ে ফোন ধরলাম। বললেন, আই অ্যাম ইমপ্রেসড!!  অনেক খেটেছো তুমি!! এইবার হয়েছে। তাও পুরাটা না কিছুটা!!

কয়েকমাস পরে দেখা গেল যে বিষয়ের ওপরে কাজটা করতে হবে তার রেসপন্ডেন্ট পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্যের ব্যপার। টপিকটার আরও নতুন কিছু পরিবর্তন হলো। তো কি হলো? সেই প্রায় হয়ে  যাওয়া , রাতের পর রাত জেগে লেখা প্রপোজালটারও বিনে জায়গা হলো। আবার নতুন করে অন্য এঙ্গেল থেকে পড়া শুরু করা!! পাশাপাশি টাইটেল কি হবে, তার ওপরেও কাজ করতে দিলেন।

বললাম, তুমি ঠিক করে দাও।

বললেন, মনে রাখবে আমি তোমার ন্যানী (বাচ্চা দেখাশুনা করেন যিনি) না। নিজের কাজ নিজেকেই করতে শিখতে হবে।

আমি বুঝতেই পারছিলাম না যে, এনরোল না হয়েই এত কাজ!! যতবারই ভর্তির অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে কথা বলি, উনি বলেন এখনও প্রস্তুত নও তুমি!! এ কোন পরীক্ষা!! অবশেষে অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম পূরনের জন্য বললেন। এবং অবধারিতভাবে এক ফর্মই যে কতবার সংশোধন করা হলো আর আমি নতুন করে পূরণ করলাম তার কোন হিসাব নেই!! আজ সব কিছু পাঠিয়ে অফিসিয়ালি অ্যাপ্লাই করলাম।  জানি না, হাজার ঝড় ঝাপটার ভেতরেও আমার এক বছরের এত পরিশ্রম জলে যাবে নাকি টিকে থাকতে পারবো শেষ পর্যন্ত।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: