করোনাভাইরাস ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি

তিন-চারদিন আগেও আধাবেলা রিকশা চালালে হয়তো ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় হতো। এখন এর অর্ধেক আয় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। জমার টাকা দেয়ার পর একজন রিক্মাচালকের নিজের খাবারের টাকাই থাকার কথা না। করোনা প্যানডেমিকের এই সময়, বিশেষ করে এই ১০ দিন অর্ধেক টাকাতেও হয়তো নিয়ে যাতে যেকোন রিক্সাওয়ালা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে; কিন্তু যাত্রী কোথায় অথবা যাত্রী পেলেও এই অর্ধেক টাকায় তার সংসার কিভাবে চলবে?? এভাবে চলতে থাকলে দু-এক দিনের মধ্যে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হবে এই পরিবারটি এবং এই পরিবারের মতো আরও অনেরক পরিবার। ’ তখন আপনারা বলবেন যে, মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি নেই, এদের জন্য সবাই বিপদে পরবে ইত্যাদি। কিন্তু, এদের খাবার ব্যবস্থা কি আপনি বা আমি করতে পারবো? না তো, সরকাররই তো করছে, তারপরেও যে এরা কেন সরকারের কথা অমান্য করে ছুটছে!!! সত্যিই তো প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য যেসব প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছেন, তা হল

> নিম্ন আয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘরে-ফেরা’ কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা প্রদান করা হবে।

> গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ প্রদান করাহবে। জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

> ভাষাণচরে ১ লাখ মানুষের থাকার ও কর্মসংস্থান উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কেউ যেতে চাইলে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

> বিনামূল্যে ভিজিডি, ভিজিএফ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। একইভাবে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা ও দেওয়া হচ্ছে।

ভিজিএফ কার্ডে নামের তালিকা তৈরীতে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতি আমার চোখে দেখা। গবেষনার কাজে সেসব অঞ্চলে গিয়ে দেখেছি যে, যাদের জন্য এই ব্যবস্থা তাদের কোন লাভই হয়নি; বরং যাদের মাধ্যমে এই সুবিধা তাদের পাওয়ার কথা তারাই ‘প্রকৃত সুবিধাভোগী’!! ভিজিএফ কার্ড তৈরীতে অর্থের লেনদেন, একেই পরিবারে ২-৩জন, ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের পরিচিত ও পরিবারের সদস্যদেরকে দরিদ্র দেখিয়ে নাম তালিকাভুক্ত করা ,এলাকায় নেই সে সব পরিবারের সদস্যদের তালিকায় নাম অন্তর্ভক্তি এসব সবারই জানা। ভবিষ্যতে ত্রাণ না পাওয়ার ভয়ে বেশিরভাগ পরিবারই কোন অভিযোগ করবেন না, করোনার আগে না খেয়েই তখন পরিবারের সদস্যরা মারা যাবে যদি পরিস্থিতি ইউরোপের মতো গতিতেই খারাপ হতে থাকে। আমি এমনও দেখেছি আমার গবেষনার কাজে গিয়ে যে, স্থানীয় ক্ষমতাধরদের পোষা গুন্ডাবাহিনী আমরা যেখানেই যাই সেখানেই দূরত্ব বজায় রেখে সাথে সাথেই থাকে, যেন কেউ বেফাঁস কিছু না বলতে পারে বা বললেও কে বলল সেটা তাদের মনিটরিং এ থাকে।

নিম্ন আয়ের মানুষদের ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হবে। করোনার অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় খোলাবাজার ব্যবস্থার (ওএমএস) মাধ্যমে এ চাল বিক্রি করা হবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে শিগগিরই এ কার্যক্রম শুরু হবে। 

জরুরি ভিত্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে সারাদেশে ৫০ লাখ কার্ডধারী নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি কর্মসূচি চালু রয়েছে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের এর বাইরে এ বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে। সরকারের এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের প্রতি পরিবারকে সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি চাল দেওয়া হবে। মোট ৯০ হাজার টন চাল দেওয়া হবে। ট্রাকে করে খোলাবাজারে শহরের বিভিন্ন স্পটে কম দামে এ চাল বিক্রি করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নিম্ন আয়ের লোকজনকে নতুন করে ১০ টাকা কেজি চাল দিতে বাড়তি ১৬৩ কোটি টাকা লাগবে। তবে অর্থ ছাড়ে কোনো সমস্যা হবে না।

আপনি কি জানেন কতজন মানুষ এই চাল হাতে পাবে? এখানে দুটি জিনিস হয়, প্রথমত, তালিকায় অনিয়মের কারনে প্রকৃতজনই সুবিধাবঞ্চিত হয় এবং এবারও হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃতজনদের ভেতর যারা যারা এই চাল হাতে পাবেন, তাদের ভেতর অনেকেই আবার সেটা বেশি মূল্যে বাজারে বিক্রি করবে ও সেই বিক্রির টাকায় তেল,আলু,পেঁয়াজ ইত্যাদি কিনবে। এটা আমার চোখে দেখা বাস্তবতা। এর থেকে পরিত্রাণ কিভাবে পাবে মানুষ? সরকার এই বিষয়ে কিছু ভাবেননি। এখনই আওয়ামী ভাই-বোনেরা আমার ওপর আক্রমণ করবেন যে, সরকার আর কত কিছু করবে? সরকারকে দোষ দিলেই শুধু হবে না, আমাদেরও দোষ আছে। অবশ্যই আছে, কিন্তু আমাদের দোষ হয়েছে পরিস্থিতির কারনে আর আমি বলি এই পরিস্থিতি সরকারের বিভিন্ন চেয়ারে বসে থাকা মানুষগুলোর জন্যই সৃষ্টি হয়েছে।

আমি জার্মানির মতো উন্নত দেশকে দেখছি বাংলাদেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নিয়ে কিভাবে হিমশিম খাচ্ছে আর সেখানে বাংলাদেশের সরকার-জনতা সবাই কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছে না! আমি জানি না, তারা কি ভাবতে পারছে যে, পরিস্থিতি ইউরোপের মতো হলে তারা কিভাবে সামাল দিবে? নিম্নআয়ের মানুষ ইউরোপেও রয়েছে। ইউরোপের সকল দেশ জার্মানি বা ডেনমার্কের মতো স্বচ্ছ্বল নয়। এমনকি ‘অতি স্বচ্ছ্বল’ জার্মানির এক বিশাল অংশ কিন্তু ঘন্টায় কাজভিত্তিতে অর্থ পান। বিশেষ করে যারা শিক্ষার্থী, তাদের বিশাল অংশ হুমকীর মুখে এখনই পড়ে গিয়েছে, আর ভবিষ্যতে কি হবে সেটা ভাবাই যাচ্ছে না!! এছাড়াও যারা রেস্তোরা, দোকানে, সেলুনে বা এরকম কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ করতো তাদের কাজও এখন বন্ধ। কতদিন তাদের চাকরী বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব সেটা অনিশ্চিত!! তারপরও এই সংকটকালীন সময়ে মানুষের আলোচনায় স্থান পাচ্ছে  মৌসুমি ফসল সংকটের বিষয়টি ৷ জার্মানিতে করোনার কারণে শ্রমিক স্বল্পতা দেখা দিবে৷ প্রতিবছর জার্মানিতে মৌসুমি ফসল তোলার কাজে প্রায় তিন লাখ মৌসুমী কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়৷ শ্রমিকরা আসেন পূর্ব ইউরোপ, বিশেষ করে রোমানিয়া থেকে ৷ তবে করোনা ভাইরাসের কারণে এবার তাদের অনেককেই এবছর তাদের নিজেদের দেশেই থাকতে হবে ৷ করোনার কারণে ব্যবসা বাণিজ্যে নতুন বেঁধে দেয়া নিয়মের ফলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা।

কাজেই নিম্নআয় কিংবা মধ্যম আয় কিংবা উচ্চ আয়, পুরো ‘আয়’ প্রক্রিয়াটিই এখন করোনার সংক্রমণে আক্রান্ত। প্রত্যেকটি রোগেরই রোগ পরবর্তী প্রভাব থেকে যায়, তেমনি করোনা সারা বিশ্বের ঘন্টা বাজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে চীন, ইতালি, স্পেন এবং আমেরিকার পরেই জার্মানির অবস্থান। গত শনিবার থেকে ১৬টি প্রদেশের ২টি প্রদেশ প্রদেশকে লকডাউন করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এই দুই প্রদেশে কেউ বাইরে বের হলে ২ বছরের জেল অথবা পঁচিশ হাজার ইউরো (প্রায় ২৫ লাখ টাকা) জরিমানার বিধান করা হয়েছে। তাই কেউ বাইরে বের হলে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যথাযথ কারণ দেখিয়ে বের হতে হবে। পুরো জার্মানিতেই মানুষ স্বেচ্ছা বন্দী রয়েছে। দুজনের বেশি দেখা গেলেই সর্বনাশ এবং মানুষ মানছে। কেন মানছে আর আমাদের দেশে কেন মানে না সেটাই বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একে অন্যের ওপর দোষ চাপাতে থাকে।

জার্মানি একদিক দিয়ে একটা সুবিধা পেয়েছে, তা হলো-প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর তারা প্রফেশনাল কনটাক্ট ট্র্যাসিং শুরু করে দিয়েছিল। আসন্ন ঝড় আসার আগেই ক্লিনিকগুলো প্রস্তুতি করার সময় পেয়েছে তারা। অথচ বাংলাদেশ এত সময় পেয়েও কেন শুধুমাত্র পিপিই এরও ব্যবস্থা করতে পারলো না সেটাও প্রশ্ন!! দ্বিতীয় বিষয় হলো-স্বাস্থ্য পরীক্ষা। প্রথম করোনা কেস ধরা পড়ার পর ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা অভিযান চালায় জার্মানি। এমনকি করোনার ছোটখাট লক্ষণ প্রকাশ পেলেও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এর ফল পেয়েছে দেশটি। কিন্তু, এই ফলেও কাজ হচ্ছে না; লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।

প্রধানমন্ত্রী বলছেন, যুদ্ধে টিকতে শিখতে হবে, কিন্তু সেটা আদৌ সম্ভব নয়। ১০ দিনের জন্য যখন ‘ছুটি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তখন মানুষ কি করবে? যখন সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার কথা বলা হয় ১০ দিনের জন্য তখন মেসে এক রুমে ৩-৫ জন থাকা মানুষগুলো কি করবে? পিপিই ছাড়া দেশের সেবা দেয়া ডাক্তাররা কি করবে? যুদ্ধ এখন আসলে বাংলাদেশে কার বিরুদ্ধে সেটাই চিন্তার বিষয়!! সরকারের বিরুদ্ধে নাকি করোনার বিরুদ্ধে? জার্মানিতে করোনা এক পক্ষ আর বাকি সবাই এক পক্ষ। কিন্তু, আমাদের দেশে অনেকগুলো পক্ষ, কে যে কার পক্ষ আর কে যে বিপক্ষ; এটাই মূল সমস্যা!!! এছাড়াও, এরকম ঘনবসতিপূর্ন দেশ আরও বেশি ভীত হওয়া দরকার!! কিন্তু হচ্ছে না, হাসি তামাশা করছে!!

যে ব্যবস্থা নিলে আদোতেও মানুষগুলো টিকে থাকতে পারবে, সরকারের সেরকম কিছু চিন্তা করা প্রয়োজন। সেই ভিজিডি, ভিজিএফ এর পুরোনো পদ্ধতি কতদিন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবস্থার বদল প্রয়োজন সেটা যেন সরকার বুঝেও বোঝে না। বাংলাদেশে কোয়ারেন্টাইন সম্ভব নয়। যেকোন একটি বস্তিতে টয়লেট ২০জনের জন্য একটা বা দুইটা, সব কিছু সেখানে কমন, আপনি কিভাবে তাদের ছোঁয়া থেকে বাঁচাবেন। তাদের জন্য এমন কিছু চিন্তা করতে হবে যেটা এই দুর্দিনে কাজে দিবে। গৎবাঁধা চিন্তার বাইরে কিছু।

সরকারের আমলাব্যবস্থার পুরো পরতে পরতে চুরি, এরা এমন যে পরিস্থিতিও বোঝে না। চুরি সব দেশেই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় হয়েই থাকে, এরা জরুরী অবস্থাও বোঝে, পরিস্থিতিও বোঝে। জার্মানির চ্যান্সেলর কোয়ারেন্টাইনে গিয়েছেন, জরুরী ব্যবস্থায় যেমন চলার কথা তেমনিই চলছে, শুধু চিন্তা করেন যে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী কোরেন্টাইনে গিয়েছেন!!! তাঁর আশেপাশের চোরেদের জন্য সেটা হবে ঈদের খুশি!! চুরির আরও ব্যাপক চান্স। অন্যেরা মরুকগা, আমি আমার আখের গোছাই। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান একা সব কাজ করেন না, প্রতিটা কাজ করার জন্য আলাদা দফতর রয়েছে। কিনউত, হায় আমাদের দেশের দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্তরা ডাক্তারের পিপিই এর চেয়ে ম্যাজিষ্ট্রেটের অফিসের সবার পিপিই পরাকে বেশি গুরুত্ব দেয়!! আর শুধু সরকারকে দোষ দিলেই হয়না। আমাদেরও দোষ আছে। করোনার সংক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ দিলে সবাই দল বেঁধে সমুদ্র বিলাসে যায়,  মসজিদে নামাজ বন্ধ করা যাবেনা বলে বিক্ষোভ মিছিল করেন, করোনা রোগী কে স্বাস্থ্যসেবা দেবার মতো ভয়াবহ অপরাধে আমরা বিক্ষোভ করি ও হাসপাতালের ম্যানেজারকে মারধোর করি, কোয়ারেন্টিনে থাকতে দিলে পালায় যান, করোনা আল্লাহর গজব নাকি গজব না এই নিয়ে মারামারি করে এক জন আরেকজন কে মেরে ফেলেন!! হলি কাউ!! কি কিউট আমরা, তাই না?? 

আমি জার্মানিতে বসে করেনার ভয়ে কাঁপছি, কি প্রচন্ড দুর্দিন আমাদের শুধু আমরাই বুঝতে পারছি। আপনারা কেন পারছেন না ?? যাকে যে ভাষায় বোঝানো প্রয়োজন, তাকে সেই ভাষাতেই বোঝানো হোক। যে কোয়ারেন্টাইন বোঝে না, তাকে তার ভাষাতেই কোয়ারেন্টাইন বোঝান। তবু বোঝান, হাসি তামাশা বন্ধ করেন, পিপিই পরে সং সেজে ফটো সেশন করে মানবতার অপমান করেন না, কঠিন বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন না। ঠেলার নাম বাবাজী, কিন্তু যখন আসল করোনার ঠেলায় আমাদের মতো পরবেন তখন কেউ আর বাঁচানোর থাকবে না।

Comments are closed.

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: