জার্মানিতে নির্বাচনে আমার জয়: বৈষম্যের রাজনীতি বনাম লড়াই

সহজভাবে বললে ‘প্যারেন্টস অ্যাডভাইজারি কাউন্সিল’ বা ‘অভিভাবক পরামর্শ কমিটি’, যেকোনোটিই বলা যেতে পারে। জার্মানিতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্ডারগার্টেন কিংবা স্কুলের যেকোনো সিদ্ধান্তই ইলেক্টেড সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নিতে হবে। এমনকি শিশু-কিশোরবিষয়ক অফিস বা অধিদপ্তরগুলোতেও যেকোনো সম্পৃক্ত নির্দেশনার ক্ষেত্রে বলে, প্রথমে এলটার্নবাইরাটের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে। তারপর অন্য অভিভাবকদের মাঝে সেই তথ্য বণ্টন করা হয়ে থাকে। একই সঙ্গে এই কাউন্সিল শিশু অধিকার, স্কুলের পরিবেশ, ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে; এদের অবজ্ঞা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

আমার ছেলের প্রথম কিন্ডারগার্টেনে প্রথম যে নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলাম, সেখানে জার্মান অভিভাবকেরা প্রার্থী হয়েছেন এবং জয়লাভ করেছেন। খুবই ভালো স্কুল, কিন্তু এমন অনেক বিষয় বা বৈষম্যের কথা শুনতাম, যা কিনা ওই অভিভাবকদের বলার জায়গা এই কাউন্সিলই হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তাঁরা তাঁদের কাছে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, অনেকের ভাষায়, কাউন্সিলের সদস্যরা অভিবাসী, অ্যাসাইলাম সিকার কিংবা নন-জার্মান কিন্তু জার্মান নাগরিকদের কথা নাকি গুরুত্ব দেয় না!
তো আমি বলেছিলাম, তোমরা কেন নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াও না? তারা বলেছিল, অনেক বাধা আছে, যেমন জার্মানরা চায় না অন্য ‘চামড়া’র কাউকে ভোট দিতে; অন্য কেউ দাঁড়ালে ভোট পাবে না; জার্মান ভাষায় দক্ষতা না থাকাটাও বিরাট চ্যালেঞ্জ, সর্বোপরি প্রধান বিষয় হলো সাহসের অভাব। নানা রকমভাবে স্কুলের বাচ্চাদের ভেতরেও আমি বৈষম্যমূলক আচরণ লক্ষ করলাম। যেমন ম্যানেজমেন্ট জার্মান আর নন-জার্মান এভাবে পৃথক্‌করণ করছে। এশীয়দের একসঙ্গে খেলতে বলছে, খাওয়ার সময় বসতে বলা, কোথাও স্কুল থেকে নিয়ে গেলে এশীয় বাচ্চারা থাকলে তাদের একসঙ্গে হাত ধরিয়ে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি নানা রকম বিষয় চোখে পড়ার মতো। আমি যখন তাদের কাছে জানতে চেয়েছি, তারা যে উত্তরটি দিয়েছে, সেটি আমি জবাবদিহি চাওয়ার আগেই জানতাম! ওরা নিজেরাই নাকি এমন করে। অথচ আমি, দেখেছি যে ভাষা আর চামড়ার রঙের কারণে ওরা প্রথম দিন থেকেই ‘অন্য’ হয়ে যায়! এই বিষয়ে যদিও কিন্ডারগার্টেনের অনেক কিছু করণীয়, তারপরও তারা এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না এবং এর মধ্য দিয়েই এর ‘স্বাভাবিকীকরণ’ করে ফেলেছে।

এ ছাড়া শিশুদের ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না। যেমন আমার নতুন এক প্রতিবেশী ভারত থেকে এসেছে। তার সন্তান ক্লাস ফোরে এসে ভর্তি হয়েছে এবং বলে নেওয়া ভালো যে জার্মানিতে ক্লাস ফোর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। কারণ, এরপর ক্লাস ফাইভে ওঠার সময়েই নির্ধারণ করা হয় যে একজন শিক্ষার্থী কোন ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করবে। এটি তার ফলাফল ও তার শিক্ষকদের মতামতের ওপর নির্ভর করে হয়ে থাকে। তো দেখা গেল, সে কিছুই বুঝতে পারছে না, আর শিক্ষকেরাও কোনো সাহায্য করছে না। তার মা সব শিক্ষকদের কাছে গেল, কেউ সহযোগিতা করল না। তার মা আমাকে বলল, তার সন্তান নাকি খুব ভালো পড়াশোনায়, এখন যদি শুধু ভাষার কারণে তার ফলাফল খারাপ হয়, তাহলে তাদের অনুশোচনার অন্ত থাকবে না! শেষ পর্যন্ত জার্মান স্কুল থেকে সরিয়ে ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে দিতে বাধ্য হয়েছি, যেখানে ইংরেজিতে পড়াশোনা করানো হয় এবং প্রাইভেট!
আমরা শহর বদল করে যখন অন্য আরেকটি শহরে এলাম। সন্তানের নতুন কিন্ডারগার্টেনে এলটার্নবাইরাটের নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হলো, আমি মনোনয়নপত্র জমা দিলাম। আমার কাছে এটি একধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল, একধরনের বেয়াড়াপনা। ওর স্কুলের শিক্ষকেরা বললেন, সবাই নাকি খুব অবাক হয়েছেন যে আমি প্রার্থী হয়েছি। একেক স্কুলের নির্বাচনের একেক ধরন। করোনাকাল হওয়ার জন্য নির্বাচনের সেই ধরনেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। তাই তিনটি ধাপে নির্বাচন।

প্রথমত, আমাকে সন্তানের সঙ্গে ছবিসহ এটি ফর্ম পূরণ করতে হয়েছে, যেখানে আমার প্রোফাইলসহ আমি কেন নির্বাচনে লড়তে চাই তার ফিরিস্তি দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সব অভিভাবক, ডিরেক্টরিয়াল বোর্ড ও স্কুল ম্যানেজমেন্টের সামনে আমাকে ছোট্ট একটি প্রেজেন্টেশন দিতে হয়েছে। প্রেজেন্টেশন দিতে হয়েছে জার্মান ভাষায়, এটি ছিল আমার জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ, সেদিন মনে হয়েছে যেন চাকরির ইন্টারভিউ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইভার সময়েও মনে হয় না এত পালপিটিশন হয়েছে! আমাকে এই প্রেজেন্টেশনের আরেক দিন বিকেলে জানানো হয়েছে, যেখানে অন্য জার্মান অভিভাবকেরা আমার থেকেও আগে জেনেছেন!
তৃতীয়ত, নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়া আর অন্যের ভোটের জন্য অপেক্ষা করা। ব্যালট বক্স, ব্যালট পেপার নিয়ে প্রার্থীদের ছবি ও প্রোফাইল মূল ফটকে ঝুলিয়ে দিয়ে নির্বাচন শুরু হলো মাস্ক পরে।

যা–ই হোক, সবাই ধরে রেখেছিল যে আমি কোনো ভোটই পাব না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ভালো ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছি। এই জয়কে আমি প্রকাশ করছি ‘চামড়া’র জয় হিসেবে। দুভাবে এটি চামড়ার জয়; এক, সাদা চামড়ার বিপক্ষে জয়, দুই, ‘অন্য’ চামড়ার পক্ষে জয়! আমি কেন ভোট পেয়েছি, এটি আমার কাছে স্পষ্ট। আমার ‘চামড়া’র রং কারও কাছে স্বস্তির জায়গা হয়েছে, আমার ‘মুসলিম’ পরিচয়ও কারও কাছে স্বস্তির জায়গা করে দিয়েছে; আমার সামাজিকতা ও আন্তরিকতাও তাদের স্বস্তি দিয়েছে! সর্বোপরি তারা ভেবেছে, যাক কিছু বলতে পারার তো একটা জায়গা হয়েছে! এবং আমি সত্যিই প্রান্তিক অভিভাবকদের নেতৃত্ব দিচ্ছি! যাদের বলার জায়গা থেকেও নেই, যাদের গুরুত্ব থেকেও নেই, যাদের কণ্ঠ অবরুদ্ধ করে রাখে সিস্টেম, সন্তানের হওয়া বৈষম্য কিংবা যেকোনো কিছুর জন্য যারা জবাবদিহি চাইতে ভয় পায়!
ভালো লাগেনি যখন ম্যানেজমেন্টের প্রধান ব্যক্তি অফিশিয়ালি সরাসরি আমাকে অভিনন্দন জানান। তাঁর অভিব্যক্তি মনে রাখার মতো ছিল! একটা অবিশ্বাস এবং একটা বিরক্তিসহ কী হবে কী হবে ভাব; যা কিনা আমাকে মোটেই অপ্রস্তুত করেনি! এর মাঝেই এই ছোট নির্বাচন ঘিরে নানা রাজনীতি আমাকে অভিভূত করেছে যে একজন জার্মান অভিভাবককে যিনি কিনা নির্বাচনে জয়ী হননি, তাঁকে নেওয়ার জন্য কীভাবে বারবার ফলাফলের সিদ্ধান্ত বদলের খেলা চলেছে! এবং সে জন্য তাঁরা যথেষ্ট ‘যৌক্তিক’ কারণও দেখিয়েছেন!
যা–ই হোক, আমি চেয়েছিলাম প্রান্তিক অভিভাবক হিসেবে, প্রান্তিক অভিভাবকদের পাশে দাঁড়াতে। তার প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে। মূল ধাপ হলো লড়াই করার ধাপ। আমি দেখলাম এই কমিটির ভেতরেই কী বৈষম্যমূলক আচরণ করা হলো। কিন্তু তা যেন খুবই স্বাভাবিক! সবাই জার্মান ভাষায় কথা বলছেন এবং যিনি জার্মান নন, তাঁকে নিয়ে তাঁদের একটুও চিন্তা নেই যে তারা বুঝতে পারছে কি না! এবং তারা রীতিমতো আমাকে সঙ্গে নিয়ে, অথচ আমাকে ছাড়া কী দারুণ কমিটির সভা চালিয়ে যেতে থাকল প্রথম তিন দিন। এমনও হয়েছে, স্কুলশিক্ষক কমিটির কেউ যখন আমার মতামত জানতে চেয়েছে, তারা সেটাও বলতে নারাজ! আমার কথা বলা না–বলা নিয়ে রীতিমতো শিক্ষক কমিটির সঙ্গে এলটার্নবেরাইটের তর্কযুদ্ধ চলল! হলি কাউ!
আমার কর্মজীবনে দেখেছি, একজন বিদেশি ব্যক্তি থাকলেও আমরা সেই সভাটা কিংবা প্রেজেন্টেশনটি ইংরেজিতে করতে চাই বা করার নির্দেশ পাই। অথবা যে কিনা ইংরেজি ভাষায় দক্ষ, সে আর কিছু পারুক কিংবা না পারুক, তাকে ভালো পোস্টটিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। অথবা আমরা রাস্তায় কোনো সাদা চামড়ার মানুষ দেখলে ইংরেজি পারি কি না পারি, ইংরেজিতে কথা বলার আমাদের যে চেষ্টা, সেটি আসলেই কি নিন্দনীয় নাকি নিন্দনীয় নয়? প্রতিটা চাকরির ইন্টারভিউয়ে ইংরেজিতে বলার যে পারদর্শিতা দেখাতে হয়, তার কতটা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে? আমরা সরাসরি ‘কথা’ বলাকে বেয়াদবি হিসেবে দেখি! অথচ জার্মানরা রাস্তায় অপরিচিত কারও সঙ্গেও কথা বলতে হলে প্রথমেই শুরু করবে জার্মান ভাষা দিয়ে। মানে হলো তিনি ধরেই নেন যে জার্মানি তো আছেন, জার্মান ভাষা আপনি জানবেনই; ইংরেজি জানলেও কথা বলতে চান না। চাকরিতে নিজের ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং বিশেষ কিছু চাকরির ক্ষেত্রে উল্লেখ করে দেওয়া থাকে যে ইংরেজি ভাষার দক্ষতাও প্রয়োজন। জার্মান ভাষা জানলে চাকরিতে দ্রুত পদোন্নতি হওয়া সম্ভব! যেখানে আমাদের দেশে বাংলা ভাষা প্রায় যেন বিলুপ্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছে। এই যে নিজের ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া, এটি আমাদের ভেতরে নেই। বাংলার ভেতরে ইংরেজি শব্দ কিংবা বাক্য ব্যবহার না করলে আমাদের মর্যাদা যেন ক্ষুণ্ন হয়! আর বলতে পারলে তো তার ‘সামাজিক স্ট্যাটাস’ আকাশে উঠে যায়! জার্মানরা ইংরেজি না পারাকে কোনো লজ্জার বলে মনে করে না, কিন্তু আমরা করি।

সরাসরি কাজের মধ্য দিয়ে এটা শিখেছি, লড়াই যদি করতে চাই, তাঁদের ভাষায় লড়াই চালাতে হবে। তাঁদের ভাষায় বোঝাতে হবে যে তাঁরা যাঁদের ‘অন্য’ মনে করছেন, তাঁরা কী চান। এমনকি সেই শিশুদের দিকেও নজর দিতে হবে, যারা কিনা হঠাৎ নিজের ভাষা থেকে অন্য ভাষার মাঝে এসে ডিলেমায় চলে যেতে পারে। সাধারণত এক বছর পর যেকোনো শিশুকে ক্রিপে-তে দেওয়া হয়, যেখানে শিশুদের দেখাশোনার সঙ্গে সঙ্গে তাকে সামাজিক কমিউনিকেশন, মানসিক বিকাশের সহায়তা করে এমন খেলা ইত্যাদি নানা ধরনের কমিউনিকেটিভ শিক্ষা দেওয়া হয়। যেহেতু এ বয়সটি শিশুদের ভাষা শেখারই বয়স, তাই খুব সহজেই বাকিদের সঙ্গে সেই শিশু জার্মান ভাষা শিখে ফেলে। কিন্তু যে শিশু তার নিজের মাতৃভাষা ইতিমধ্যেই শিখে ফেলেছে, তার জন্য কিন্তু নতুন ভাষা এতটা অনায়াসে শেখা সম্ভব নয়। তার জন্য কিছুটা ভিন্ন পরিকল্পনার প্রয়োজন। এই ডিলেমা কিন্তু শিশুদের মানসিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়। কিন্তু সেই বোধটা তাদের মাঝে থেকেও যেন নেই! তারা মনে করে, জার্মান স্কুলে যাচ্ছে, তারা নিজেরাই শিখে নেবে। কিন্তু এই শেখানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকদের/স্কুল ম্যানেজমেন্টের/এলটার্নবেরাইটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যা কিনা অভিবাসী শিশুদের সামনের চলার পথকে সহজ করবে, সেটা তাঁরা এড়িয়ে যান!

যা–ই হোক, আমার প্রেক্ষিত বোঝার জন্য কিছু সময়ের দরকার ছিল, সদস্যদের বোঝার জন্যও অবশ্যই। অবশেষে আমি লড়াই সরাসরি শুরু করেছি অভিবাসী অভিভাবকদের পক্ষ নিয়ে, তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। বৈষম্যের এই রাজনীতির মাঝে থেকে সেই রাজনীতির বিরুদ্ধেই লড়াই করাটা কঠিন। কিন্তু অধিকার রক্ষায় অচল থাকলেই কেবল পরবাসে শিশুদের ভবিষ্যতের সুরক্ষা সম্ভব।

Comments are closed.

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: