রোম শহরের পথে পথে

হান এয়ারপোর্ট, জার্মানি

– তোমার ব্যাগের কসমেটিকস সব বের করো, অফিসার বললো।

হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করেছি। লাইনে দাঁড়িয়েছি, সামনের প্রায় সবাই খানিকটা বিব্রত, কেউ ক্ষুব্ধও! হচ্ছেটা কী? এদিকে আমাদের বাদর স্বভাববিশিষ্ট পুত্রও লম্ফঝম্ফ দিচ্ছে। উনি আবার বেশিক্ষণ এক জায়গাতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। আমার সামনে ছেলের বাবা, অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ঝাড়ি দিলো! আমি বরাবরই সব কিছুতেই স্লো। তো তার রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে আরও খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকাই খেয়ে গেলাম। ভাবলাম নিশ্চয়ই আমার দোষ। কিন্তু কী দোষ তখনও বুঝে উঠিনি। যথারীতি সাদামুখো মহিলার কথা শুনে বের করলাম … লোশন, সান ক্রিম, শ্যাম্পু, শাওয়ার জেল।

– যাও, এইরকম একটা ব্যাগ এনে এগুলা ভরো, অফিসার আবারও বললো।

এরই ভেতর পুত্র অপরপাশে চলে গিয়েছে! আমি একবার ছেলে, একবার বর – এইরকম ঝামেলার পরিস্থিতিতে আরেকবার ভস্ম হলাম, চলে এলাম ছেলেকে সামাল দেবার জন্য। এদিকে ব্যাগে ছেলের পানির বোতলও তারা বের করে রেখে দিয়েছে। কিন্তু ছেলে নাকি পানি খাবে, আবার চিপসও খাবে। অফিসাররা সবাই যারপরনাই আনন্দিত। কেন? কারণ তারা আসলে সবার জিনিস ধরছে আর ফেলে দিচ্ছে। জনগণের জিনিস ফেলার মজাই আলাদা।

অামাদের তিন সদস্যবিশিষ্ট টিমের ক্যাপ্টেন, আমার বর ডাবল রক্তচক্ষু নিয়ে আমাদের ব্যাগসমেত এলেন। এবং যথারীতি আমার দিকে তাকালেন, কেউই দেখতে পেলো না, কিন্তু আমি ভস্ম হয়ে গেলাম, আমার ছাই মেঝেতে পড়লো!!! টিমের ক্যাপ্টেনকে শুধু পেস্ট আর ব্রাশ ধরিয়ে দিয়েছে। যাক, তারা যে অন্তত দাঁতের যত্নে সচেতন এটা ভেবে শান্তনা পেলাম। এর আগে সবসময় এই জিনিসগুলো মেইন লাগেজে থাকতো, এইবার হ্যান্ড ব্যাগে নিয়েই ধরা খেলাম। তো দোষ কার? যে ব্যাগ গুছিয়েছে, অবশ্যই তার! আমার আর কি!

রোমা, ইতালি

প্রায় রাত ৮টার দিকে প্লেন ল্যান্ড করলো সাত পাহাড়ের শহর ইতালিতে। অনেক স্থানীয় লোককথায় জানা যায়, যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় সাড়ে ৭শ’ বছর আগে থেকে রোম নগরীর নির্মাণ কাজ শুরু হয়!! রাতের আকাশ থেকে জ্বলজ্বলে রোম শহরকে দেখে কেমন যেন শিহরিত হলাম!! এয়ারপোর্টে নেমে প্রথমেই বাসের টিকেটের খোঁজ নিলাম। ক্যাপ্টেন দু’জনের জন্য টিকেট কেটে ফেললো। পুত্রের ফ্রি। বাসে উঠতে যাবো এমন সময় এক বুড়া আমাদেরকে খুব হাত নেড়ে কিছু বললো।

– ড্রাইভার বলছে, ….. ( যা বলছে কিছুই বোঝা গেল না!! )

ক্যাপ্টেন বললো, ইংরেজি তে বলো, তোমার ভাষা বুঝতে পারছি না!

– ড্রাইভার বললো, …( যা বলছে কিছুই এবারও যথারীতি বোঝা গেল না!!)

ক্যাপ্টেন বললো, সরি, তুমি ইংরেজি জানো?

– ড্রাইভার বললো, …… !!!!

ক্যাপ্টেন এইবার মেজাজ খারাপ করে তাকিয়ে থাকলো।

ড্রাইভার বললো, নো ফুড।

মনে মনে ভাবলাম, ব্যাটা বদ, ইংরেজি জানিস যখন একগাদা ভাষা বললি কেন? আমাদের হাতে কোন খাবার আছে নাকি?

ঐ ব্যাটাকে নিচে রেখে বাসের দোতলাতে উঠে বসলাম। বাস ছেড়ে দেয়ার কিছুক্ষণের মাঝেই পুত্র অনেক কষ্ট করেও তার চোখ খোলা রাখতে পারলো না; অবশেষে টিম ক্যাপ্টেনের কোলে ঘুম! বাস থামলো টার্মিনালের কাছে গিয়ে। হোটেল অনলাইনেই বুকিং করা ছিল। হোটেল আন্দ্রিওতি, তিন তারার হোটেল। টার্মিনালের কাছেই। টার্মিনালে বাস আর ট্রেন দু’টোরই মেইন স্টেশন। আশেপাশে প্রচুর খাবার দোকান। গুগল ম্যাপ আমাদের হোটেলের পথ চিনিয়ে নিয়ে গেল। পুত্রকে এবার আমার কোলে নিয়ে হাঁটার পালা। সে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে ততক্ষণে, কিন্তু কোল থেকে নামছে না। গলা ধরে ঝুলে আছে, সে বাইরে বের হলেই সেসময় বান্দর স্বভাববিশিষ্ট হয়ে যেতো, বাবা-মায়ের গলা ধরে ঝুলে পড়তো! বলে রাখা ভাল, স্থির হয়ে বসে থাকা সবসময়েই তার স্বভাব বিরুদ্ধ। রাতের রোমের রাস্তা দেখে মনে হতে লাগলো রোমের পরিবেশে এখনো যেন ভাসে পুরনো গন্ধ, পুরনো রহস্য ভেসে বেড়াচ্ছে।

অবশেষে হোটেলে চেক ইন করলাম তখন রাত ৯ টা। লাল কার্পেটে ঢাকা রিসিপশন থেকে চাবি নিয়ে ওপরে উঠলাম। ডিনার করতে বাইরে যেতে ইচ্ছা করছে না, অগত্যা টিম ক্যাপ্টেন ভরসা। তিনি এক অসাধারণ স্ট্যামিনায় ভরপুর ক্যাপ্টেন, টিমের সামান্য কষ্টেও তার প্রাণ কাঁদে, তাই নিজের ক্লান্তি ভুলে খাবারের সন্ধানে গেল!

বাংলাদেশি অভিবাসী, রোমা

বাসের টাইমটেবল দেখে আমরা বেরিয়ে পরলাম কলোসিয়ামের উদ্দেশ্যে। টার্মিনাল পর্যন্ত হেঁটে যাবো, ফুটপাতে বেশ কিছু সুভিন্যরের দোকান সারি সারি। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পুত্র তার স্বভাব অনুযায়ী দৌঁড়ে গিয়ে ঢুকলো; দেখি দোকানের মালিক বাংলাদেশি। আমরা ভাবলাম, দেশি বলে কথা, কিছু কিনি। ক্যাপ কিনলাম, আর পুত্র ছোট্ট একটা গাড়ি ফ্রিতে পেলো, দোকানদার কিছুতেই দাম নেবে না আমাদের থেকে। আমাদের ছেলেকে দেখে তার দেশে থাকা ছোট্ট ছেলের কথা মনে পড়ে গিয়েছে বলে মন খারাপ করলো আমাদের কাছে।

এতদিন শুধু পত্রিকাতে পড়েছি, পুরো ইতালি ভ্রমণে অভিজ্ঞতা হলো যে, পুরো ইতালি বিশেষ করে রোম শহর পুরোটাই বাংলাদেশি প্রবাসী দিয়ে ভর্তি। এখানে কেউ বৈধভাবে আছে, কেউবা অবৈধভাবে। বেশিরভাগই সাগর পাড়ি দিয়ে অাসা অবৈধ অভিবাসী হওয়ায় দেশেও যেতে পারে না ইচ্ছা করলেই। অনেক কষ্টে দিন পার করে। উপার্জন করে দেশে পাঠায় নিজেদের সংসারে। কত অল্প বয়সী ছেলেরাও কত ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে কত জায়গা দিয়ে ঘুরে অবশেষে এখানে পৌঁছেছে একটু ভালভাবে থাকার আশায়; কিন্তু পারছে কি? বেশিরভাগই টুরিস্ট এরিয়াতে কিছু না কিছু বিক্রি করছে। এক কথায় যেন ছোটখাট বাংলাদেশ! যারাই বুঝতে পেরেছে যে আমরা বাংলাদেশি তারাই কিছু না কিছু আমাদের পুত্রকে দিয়েছে এবং বলাই বাহুল্য দাম ছাড়াই। কিছুতেই কেউ দাম নিবে না !!অন্যরকম এক ভালবাসা, আমরা অপরিচিত, কিন্তু যেন সবাই সবার অনেক পরিচিত, সবাই বাংলাদেশি!

কলোসিয়াম, রোমা

বিশাল লাইন কলোসিয়ামের গেইটে। অামাদের ক্যাপ্টেন জ্ঞানী ও বিজয়ী হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকালো। বললো, দেখছো, আমি অনলাইনে আগে থেকে টিকেট না কেটে রাখলে তো এই রৌদ্র আর গরমের ভেতর দাঁড়ায় থাকতে হইতো। আমার একটু জ্ঞানী হাসি দিতে ইচ্ছা করলো, কার দিকে তাকায় দিবো? পেয়ে গেলাম!! যখন অামরা টিকেট হাতে ঢুকে যাচ্ছি, তখন যারা দাঁড়িয়ে আছে লাইনে, তাদের দিকে তাকায় একটুখানি জ্ঞানী হাসি দিলাম। ঢুকলাম কলোসিয়ামের ভেতরে। আশেপাশের সবার চেহারা দেখে মনে হলো, এমন সৌন্দর্য্য এরা আগে কোনদিন দেখে নাই, তাই সবার চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে!

টিম ক্যাপ্টেন হতাশ চোখে তাকিয়ে থেকে পুত্রকে বললো, এই ভাঙ্গা জিনিস দেখার জন্য তোমার মা কতদিন থেকে উতলা! তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো, যাও মনে মনে ভাবো কত বছর আগে এখানে কিভাবে কী হতো, আর তাকায় তাকায় দেখো! বেচারা! তার ইচ্ছা ছিল ইতালিতে না এসে, বার্সেলোনার মাঠে গিয়ে খেলা দেখবে! এটা মনে হলেই যিনি আনন্দে আটখানা হয়ে যান, তার তো এই ভাঙ্গা জিনিস দেখে হতাশই লাগার কথা!

এখানেই মজা, যার কল্পনা শক্তি যত ভালো, তার তত ভালো লাগবে এই স্থাপত্যটিকে। এই ভাঙ্গাচোরার মাঝে প্রায় ২৫০০ বছরের কত অজানা গল্প লুকিয়ে আছে! সেই কত হাজার বছর আগে ছাদ ছাড়া এই মঞ্চটি তৈরী করা হয়েছিল প্রায় ৫০,০০০ মানুষের বসার উপযোগী করে! রোমের ইতিহাসের উত্থান ও শৌর্যের সময়ের তৈরি বিশাল এই এম্ফিথিয়েটার পৃথিবীর এক আশ্চর্য ঐতিহাসিক স্থাপত্য। তাকালাম সামনের দিকে অার মনে পড়ে গেলো অস্কার জেতা ছবি গ্ল্যাডিয়েটরের কথা! এই স্থাপত্য বহন করছে মানুষের প্রতি নির্মমতার গল্প, এর দেওয়ালের প্রতিটি পাথরে যেন গ্ল্যাডিয়েটরদের বীরত্ব, রক্ত, ঘামের গন্ধ গাঁথা!

৭০-৭২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে, ফ্লেবিয়ন সাম্রাজ্যের শাসক ভেসপাসিয়ানের রাজত্বকালে এর নির্মাণ শুরু হয়েছিল। দশ বছর ধরে প্রায় ৬০,০০০ ইহুদি দাসকে কাজে লাগিয়ে ৮০ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণ কাজ শেষ করেন তাঁর পুত্র টাইটাস। তিনি এটিকে ’ফ্লেবিয়ন এ্যাম্পিথিয়েটর’ নাম দিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন এবং ১০০ দিনব্যাপী এক উৎসবের আয়োজন করেন যেখানে গ্লাডিয়েটরসদের মধ্যে মল্লযুদ্ধ ও বিভিন্ন ধরনের পশুর লড়াইয়ের আয়োজন হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী চারশ বছর ধরে এটি হয়ে ওঠে রোমানদের ‘বিকৃত মনোরঞ্জনে’র একটি রক্তাক্ত লড়াইয়ের মঞ্চ। শতশত বছর ধরে এই লড়াইয়ে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ ও প্রাণী মারা গিয়েছে বলে অনুমান করা হয়। নিচের ভাঙ্গা পিলারগুলোর দিকে তাকালে যেন এক অজানা আতঙ্ক জেগে ওঠে। মনে হয় যেন দেখতে পাই সেই যুদ্ধবন্দীদের, যারা নিচের কারাগারে বন্দী থাকতো অার ডাক পরলেই মৃত্যুযুদ্ধে সামিল হতো। গ্লাডিওররা ছিল সেই সময়কালীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আর সব সমাজেই তো প্রান্তিকদের শোষণ করা, তাদের নিয়ে খেলা শোষকদের জন্য, ক্ষমতাশালীদের জন্য জায়েজ, নয় কি?

রেস্তোরা, রোমা

ট্রাস্টেভেরি (Trastevere) হল রোমের প্রাচীণ বোহেমিয়ান পাড়া। কারিগরদের দোকান, মূল টারভেন এবং দুর্দান্ত রেস্তোঁরা রয়েছে।কেউ খাবার কিনে বাইরের চত্বরে বসে খাচ্ছে, কেউবা রেস্তোরার সামনে রাখা চেয়ারে বসে। এক রেস্তোরাতে গেলাম। ।পুত্রকে নিয়ে কোথাও বসে খাওয়ার সুযোগ নেই। আগেই বলেছি, সে স্থির হয়ে বসার মানুষ নয়। আর যেখানে সে যাবে সেই জায়গাটা তার পছন্দ না হলে তো খবরই আছে আমাদের। তো সাহস করে গেলাম খেতে। পুত্র নানান ক্যারিকাচার করছে, আমরা যারপরনাই বিব্রত এবং অন্যরা অত্যন্ত আহলাদিত! সবার খাবার সাথে বিনোদন ফ্রি! দু’জন খাবার শেষ করে চলে যাওয়ার সময় পুত্রকে বললো, চল আমাদের সাথে! পুত্র কিছুক্ষণ তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো। তারপর তাদের সাথে রওনা দিলো। রেস্তোরার সবাই একসাথে আনন্দধ্বনির মতো শব্দ করলো। এখন তো ছেলে আর আমার কাছে আসে না তো আসেই না! এ কি যে বিপদ! সারাদিন সেবাযত্ন করি আমি, আর এখন কিনা সে বিদেশি বুড়াবুড়ির সাথে চলে যাচ্ছে!!

আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করলো রেস্তোরার একজন ওয়েটার। পুত্রকে চট করে কোলে তুলে নিয়ে রেস্তোরার দরজাতে দাঁড়িয়ে বলতে থাকলো, হান্ড্রেড ইউরো, হান্ড্রেড ইউরো!কে নিতে চাও, কে নিতে চাও? বাইরে রাস্তায় গমগম করছে টুরিস্টরা। তাদের মধ্যেও অানন্দধ্বনি শোনা গেল। রেস্তোরার ভেতরের সবার মাঝেও শোনা গেল! আমার পুত্র খলখল করে হেসেই যাচ্ছে। আমার পুত্রের চঞ্চলতায় কেউ বিরক্ত হলো না, এমনকি এত ব্যস্ত ওয়েটাররাও। এমন ব্যস্ততার মাঝেও তারাই বলতে গেলে পুত্রকে সামলিয়েছে এবং আমাদেরকে অনেক স্বস্তি দিয়েছে।

রোমের পথে পথে

ঠিক করেছিলাম রোমের পথে পথে ঘুরে বেড়াবো। তা ছোট্ট পুত্রকে নিয়ে সেটা বেশ খানিকটা কঠিনই ছিল আমাদের জন্য। কিন্তু রোম দেখতে হলে হাঁটার কোন বিকল্প নেই। রোম শহরের পুরাতন রাস্তাগুলোও যেন কথা বলে! শহরের একদম মাঝে কাপিতোলিনে হিলের এর পাদদেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে পিয়াজ্জা ভেনেজিয়া। এটির চারপাশ ঘেষে চারটি প্রধান রাস্তা চলে গিয়েছে রোমের। এখানে শব্দের জন্য প্রায় কথাই শোনা সম্ভব হয়না। তবে ওপর থেকে যখন দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল যে, পুরোনো আর নতুন মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছে। বিশাল এই স্থাপত্য ঘিরেই বলতে গেলে এই শহরের প্রাণকেন্দ্র। কত সিনেমায় যে এই জায়গাটির দৃশ্য দেখানো হয়েছে, তার কোন হিসাব নেই। ১৪৫৫ সালে স্থপতি ফ্রান্সেস্কো ডেল বোর্গো নিজের নকশায় এটি নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই প্রাসাদটি ইতালীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে চলে আসে এবং মিউজিয়াম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

এখানে আশেপাশে আরও অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। যেমন উত্তর দিকে আছে নেপোলিয়ানের মায়ের বাড়ি, পালাজ্জো বোনাপার্ট। এটি ১৬৬৬ সালে নির্মিত হয়েছিল। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী এই বাড়িটিতে নেপোলিয়ানের মা-ও একসময় বাস করেছিলেন। এরপরেই মূলত এই বাড়িটির নাম দেয়া হয়েছিল পালাজ্জো বোনাপার্ট!

এবার চলে এলাম স্প্যানিশ স্টেপ (Spanish Steps)। আঠারো শতকে তৈরি এই সিঁড়ি পিয়াজ্জা ডি স্পাগ্না স্কোয়ার থেকে ফ্রেঞ্চ মনাস্ট্রি চার্চ-ত্রিনিতা দেই মন্তি অবধি চলে গিয়েছে। এই স্পানিয়া স্টেপের রাস্তায় প্রচুর দোকান। আর দোকানগুলো সব বিশ্বের দামি দামি ব্যান্ডের। ১৩৫ টি স্টেপ আর তিনটি ভিন্ন টেরাস একে পবিত্র ত্রিনিতি’র দিকেই নিয়ে যায়। ওপরে উঠলে রোমান সাম্রাজ্যেরে একটি অংশ চোখে পড়ে। ভাঙ্গা অংশগুলো যেন কত অজানা গল্প বয়ে বেড়াচ্ছে। আমার কাছে এই ভাঙ্গা অংশগুলোই এত ভাল লাগছিল, বিশেষ করে যখন মনে মনে সেই রোমান সময়কার প্রতিটি চরিত্র আর ঘটনাকে আওরাচ্ছিলাম।

এবার চলে এলাম ট্রেভি ফোন্তানা (Trevi Fountain) ট্রেভি ফোন্তানা এর মধ্যে নেপচুন– সমুদ্র দেবতার মূর্তি, দু’পাশে সমুদ্র ঘোড়া; সমুদ্রের জোয়ার ভাটার প্রতীক। এখানে পয়সা ফেলার রেওয়াজ। কেন? কারণ মনে করা হয়ে থাকে যে, যদি একটি কয়েন ছুঁড়ে ফেলা হয়, তবে সে আবার ইতালিতে ফিরে আসার সুযোগ ঘটবে, দুটি ফেললে ইতালিয় কারও সাথে প্রেম ঘটবে এবং তিনটি ফেললে ইতালিয় কারও সাথে বিয়ে হবে। টুরিস্টদের ভীড়ে ছেলেকে নিয়ে সামনেই যেতে পারছিলাম না। তারপরও পুত্র লিওনেল কয়েন ফেলতে ইচ্ছুক!! কি আর করা, বাবা তার পুত্রকে কোলে নিয়ে কয়েন ফেলার ব্যবস্থা করলো অবশেষে। তো ঘটনা যেটা হলো, আমি বেশ চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলাম, যে কয়েন ফেলবে (পুত্র) তার ক্ষেত্রেই শুধু মিথটি কাজ করবে নাকি, যে কয়েন ফেলতে সাহায্য করবে (ছেলের বাবা) তার ক্ষেত্রেও ঘটবে কিনা এটি নিয়ে!!

ভাবলাম থাক, চিন্তা বাদ দিয়ে একটা ছবি অন্তত তুলে নিয়ে যাই। অবস্থা এমন যে, ছবি তোলারও উপায় নেই। কারণ, সবাই মোটামোটি ধাক্কাধাক্কি করে ছবি তুলছে কোনমতে। ছবিতে পেছনের ভাস্কর্য্য তো আসছেই না, বরং কে যে ছবির মূল মালিক তাও বোঝার কোন উপায় নেই। কোনমতে ছবি তুলে তিনজন তিনটি আইসক্রিম হাতে নিয়ে সামনের পথ ধরলাম। পুরো রাস্তায় ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট ফুটপাতের দোকান। কোথাও বা চিত্রশিল্পীকে দিয়ে কোন টুরিস্ট নিজের ছবি আঁকিয়ে নিচ্ছেন, আবার কোথাও বালি দিয়ে ভাস্কর্য্য তৈরী করছে, আর সবাই হয়তো তাকে ঘিরে দেখছে!! আমরা ইটের তৈরী রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পেলাম গিটারের বাজনা, আবার কোথাও বা ভাওলিন কাঁধে নিয়ে পুরোনো কোন সুর তুলছেন কোন বাদক।

ট্রেভি ফোন্তানার সামনে যে রাস্তা চলে গেছে সেই রাস্তা ধরে চলতে চলতে অবশেষে পৌঁছে গেলাম রোমান মন্দির আগ্রিপ্পার পান্থেওনে (Pantheon)। তখন বিকেল হয়ে এসেছে, সুবিশাল স্থাপনাটির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অনেক ঘোড়ার গাড়ি। প্রাচীন রোমের সব’চে সেরা সংরক্ষণযোগ্য স্থাপত্যকর্ম এটি। স্থাপনাটি খৃষ্টপূর্ব ২৭ সালে মারকাস আগ্রিপ্পার ইচ্ছায় নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীতে সপ্তম শতাব্দীতে এটি পোপ বনিফেসকে দান করা হয়েছিল যেন তিনি এটিকে একটি গির্জার রূপান্তরিত করতে পারেন। যা এখনও গির্জা হিসেবেই রয়েছে।

পিয়াজ্জা নাভোনা (Piazza Navona) হলো রোমের কেন্দ্রে অবস্থিত বিশাল চত্বর। হেঁটে এখানে এসে পৌঁছতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। গোঁধুলির আকাশে রঙের ছড়াছড়ি, আর তার নিচেই ফোয়ারার মুখোমুখি বসে আছি আমি। একসময় গ্রীষ্মকালে এই পুরো চত্বরকে পানির নিচে ডুবিয়ে দিয়ে ‘পানির খেলা’র আয়োজন করা হতো। দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে বাতাসে পুরোনো শহরের সুবাস নিচ্ছি আর পুত্র পুরো চত্বর জুড়ে দৌঁড়ে বেড়াচ্ছে!!

Comments are closed.

Create a website or blog at WordPress.com

Up ↑

%d bloggers like this: